287628
শিরোনামঃ
নির্বাচনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত- স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা  রমজানে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রি করবে সরকার--মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অনলাইনে নয়, সাংবাদিক কার্ড ম্যানুয়ালি ইস্যু করবে ইসি মার্কিন হামলার তীব্র শঙ্কার মাঝেই আলোচনা চায় ইরান, দাবি ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না সৌদি আরব ইরানি সেনাদের মাঝে নেই উদ্বেগ, পূর্ণ যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা জীবনযুদ্ধে গাজাবাসী; একদিকে হামলা অন্যদিকে তীব্র ঠান্ডা নির্বাচন ঘিরে লালমনিরহাটে সাংবাদিকদের সাথে জামায়াত প্রার্থীর মতবিনিময় অনুষ্ঠিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিতে সংলাপ জরুরি : শিক্ষা উপদেষ্টা কালথেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা শুরু

ভূগর্ভস্থ পানি সংকটে বরেন্দ্র অঞ্চল

#
news image

বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বরেন্দ্রে উচুঁ অঞ্চল গুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি স্তরে পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। এতে বাড়িতে বসানো শত শত সাবমার্সেবল পাম্প পুরোপুরি বন্ধ হয়েগেছে। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বিএমডিএ) প্রায় ৬০০ গভীর নলকূপ পুরোপুরি বন্ধ হয়েগেছে। এছাড়াও পানি সংকটে ধুকে ধুকে চলছে শতশত নলকূপ।

বরেন্দ্র অঞ্চলে এমন পরিস্থিতে সম্প্রতি ২৫ উপজেলা কে অতি ঝুকিপূর্ণ ঘোষনা করেছেন সরকার। চলতি বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানির স্তর উপরে উঠেনি। তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে পাশের গোদাগাড়ী উপজেলায়। গত ১৯ বছরের মধ্যে সেখানে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে উঠেছে। সম্প্রতি দেশের তিনটি অঞ্চলকে ‘পানি সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে সরকার। এগুলোর মধ্যে তানোর ও গোদাগাড়ীও আছে।

পানি সংকটাপন্ন এলাকা হলো এমন অঞ্চল যেখানে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে তা আরও বাড়ছে। বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর অধীনে, এই ধরনের এলাকাগুলো সরকার কর্তৃক চিহ্নিত করা হয় এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার ও সংরক্ষণে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।

এক জরিপের ভিত্তিতে নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচল ও গোমস্তাপুরকে পুরোপুরি পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ও ডাসকো কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, এ জরিপের ভিত্তিতে নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাঁচল ও গোমস্তাপুরকে পুরোপুরি পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও ভোলাহাট, চট্টগ্রামের পটিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলকে আংশিক পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওয়ারপোর নীতিমালার আলোকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এসব এলাকায় পানি রেশনিং করেছে। গত ২৫ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ নির্বাহী কমিটি এলাকাগুলোকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) কর্মকর্তা আল আমিন কবীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তানোরে পানির স্তর কেন নামছে এই বিষয়ে গবেষকেরা বলেন, তানোর ও গোদাগাড়ীকে উঁচু বরেন্দ্রভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তানোর উপজেলা সদরের উচ্চতা ২৫ মিটার ও গোদাগাড়ীর উচ্চতা ২০ মিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু এলাকা উচ্চাডাঙ্গা গ্রামটি তানোরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর উচ্চতা ৫২ মিটার।

বিএমডিএ বলছে, চলতি বছর তানোর ও গোদাগাড়ীতে বৃষ্টি হয়েছে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গোদাগাড়ীতে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬১৫ মিলিমিটার। এ বছর সেখানে হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ মিলিমিটার। একই সময়ে তানোরে ২০১৫ সালে বৃষ্টি হয়েছিল ১ হাজার ৩০৭ মিলিমিটার, আর চলতি বছর হয়েছে ১ হাজার ১৫৬ মিলিমিটার। ২০১৫ সালের পর এই ১০ বছরে উভয়স্থানেই চলতি বছর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

রাজশাহীর এসব এলাকায় পানি সুশাসন নিয়ে গবেষণা করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রাজ্জাকুল ইসলাম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তানোরের ভূমির গঠন একটু ভিন্ন। এখানকার ভূমি ঢালু। পানি দাঁড়াতে পারে না। ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত মাটির নিচে মিহি কাঁদার স্তর আছে। পানি নামতে সময় লাগে। এ ছাড়া অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং পরের বছর পুনর্ভরণ না হওয়ার কারণে অ্যাকুইফার মারা গিয়েও এমন হতে পারে।

বন্ধ শুধু গভীর নলকূপ আর সাবমার্সেবল পাম্পই নয়,ভূগর্ভস্থর তলদেশের পানির স্তর পরিমাপ কূপ মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়নে একটি করে অনেক গভীরতায় বসানো ছিল,সে পরিমাপ কূপ দুইটিওপানি শূন্যে বন্ধ হয়ে অকেজো হয়ে গেছে।

চৈত্রের ধুধু খড়ায় কমে গেছে খাল-বিলের পানি। শুকনো হয়ে পড়েছে অনেক পুকুরও। এমন অবস্থায় বরেন্দ্র অঞ্চলের উচুঁ অঞ্চল গুলোতে খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। বরেন্দ্র অঞ্চলে অদুর ভবিষ্যতে পানির চরম সংকট দেখা দিবে। এধরনের সমস্যার কথা অনেক আগে থেকেই পরিবেশবাদিরা বলে আসছিলেন। ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার বিগত এক যুগে দ্বিগুনের বেশি নিচে গেছে। গবেষকদের কথা আজ বাস্তবে রুপ নিতে শুরু করেছে।

২০১৪ সাল থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪টি পৌরসভা ও ৩৫ ইউনিয়নকে অতি ঝুঁকিপুর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পর থেকেই এসব ঝুঁকিপুর্ণ অঞ্চল গুলোতে প্রায় ৪৮ টি কূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থর পানি স্তরের নিয়মিত পরিমাপ করে আসছেন ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম) নামে একটি জরিপ সংস্থা।

সংস্থাটি সর্বশেষ ২০১৮ সালে মার্চ মাসের ঝুঁকিপুর্ণ এলাকায় ৪৮ টি পরিমাপ কূপ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের মাপ গ্রহন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তানোরের মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়ন এবং গোমাস্তপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নে দ্রুত গতিতে পানি নেমে যাচ্ছে। ফলে এ দুই ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ভূ-তত্ব ত্ত খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। বরেন্দ্রে অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে গবেষণা করছেন।

ড.চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান,বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামাই চিন্তিত গবেষকেরা। কারণ নিচে পানি শূণ্য হলে বালি,পাথর ফাকা হয়ে পড়বে। তাতে করে সামান্য ভূমিকম্প হলেই দেবে যেতে পারে।

এ গবেষক আরো বলেন,বরেন্দ্র অঞ্চল কে বাচাতে পানির কোন বিকল্প না। প্রথমেই ভূ-গর্ভস্থ থেকে সেচ কাজে পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর-খাড়ি বেশি করে খনন করতে হবে। বাসা বাড়ির ছাদের পানি ভূ-গর্ভস্থ ভিতরে রিফানিং করে ঢুকাতে হবে। এক কথায় বৃষ্টির পানি বেশি বেশি রির্চাজ করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের কৃষক,শিক্ষক,ঈমামগণ ও সচেতন ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। তার আগে সরকারকে এসব অঞ্চলের কৃষি জমিতে সেচ দিতে বিকল্প উপায়ে পানির ব্যবস্থা করতে পারলেই সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হবে বলে মনে হয়।

মুন্ডমালা পৌর সভার সাবেক মেয়র সাইদুর রহমান বলেন, এ এলাকার প্রধান সমস্যা এখন সেচ ও খাবার পানি। একের পর এক সাবমার্সেবল নলকূপ বসিয়েও পানি সংকট সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র দুই বছর আগে বসানো সাবমার্সেবল পাম্পগুলো পানির অভাবে একের পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।। চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই পুকুরের পানি তলানিতে। তবুও পচা দুর্গন্ধ। এখন গ্রামবাসীর খাওয়ার পানির ভরসা একব্যাক্তির বাড়িতে বসানো একইঞ্চি পাইবের সাবমার্সেবল পাম্প। তাও পানির অভবে বন্ধ হতে শুরু করেছে।

বাধাইড় ইউপি চেয়াম্যান আতাউর রহমান বলেন,তার ইউনিয়নে ১৫০টি মত সাবমার্সেবল পাম্প দিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক পাম্প তলদেশে পানি না থাকায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এতে ইউনিয়ন বাসীর খাওয়ার পানি চরম দুর্ভোগে পড়ে আছে।

অনেক পুকুর শুকিয়ে চৈৗচির হয়ে গেছে। গরু-ছাগল,হাড়িপাতিল মাজা ঘোষা সবই করতে হচ্ছে দুরদুরান্ত থেকে কেনা আনা পানিতেই। যার ফলে গ্রামে এখন চলছে পানির হাহাকার।

তিনি আরো বলেন,বোরো মৌসুমে বেশি মাত্রায় পানি ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে দুই ফুট করে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এমনটি হওয়ার কারণে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এর বরেন্দ্র অঞ্চলে দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী প্রজেক্টর জাহাঙ্গীর আলম খাঁন জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ থেকে অতিরিক্ত মিঠাপানি উত্তোলনের ফলে ক্রমাগতভাবে পানির স্তর নিচে নামছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষক রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, ১৯৮০ সালে এ অঞ্চলে পানির স্তর মাত্র ৩৯ ফুট নিচে ছিল। তবে ৩৬ বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে ১১৮ ফুট নিচে নেমে গেছে। ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটা পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, দেশের গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার হলেও এ এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতে ভূগর্ভস্থ পানির গড় পুনর্ভরণের হার দেশে ২৫ শতাংশ হলেও এ অঞ্চলে মাত্র ৮ শতাংশ।

রাজশাহী প্রতিনিধি

২৯-৯-২০২৫ দুপুর ২:১১

news image

বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বরেন্দ্রে উচুঁ অঞ্চল গুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি স্তরে পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। এতে বাড়িতে বসানো শত শত সাবমার্সেবল পাম্প পুরোপুরি বন্ধ হয়েগেছে। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বিএমডিএ) প্রায় ৬০০ গভীর নলকূপ পুরোপুরি বন্ধ হয়েগেছে। এছাড়াও পানি সংকটে ধুকে ধুকে চলছে শতশত নলকূপ।

বরেন্দ্র অঞ্চলে এমন পরিস্থিতে সম্প্রতি ২৫ উপজেলা কে অতি ঝুকিপূর্ণ ঘোষনা করেছেন সরকার। চলতি বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানির স্তর উপরে উঠেনি। তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে পাশের গোদাগাড়ী উপজেলায়। গত ১৯ বছরের মধ্যে সেখানে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ওপরে উঠেছে। সম্প্রতি দেশের তিনটি অঞ্চলকে ‘পানি সংকটাপন্ন’ হিসেবে ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে সরকার। এগুলোর মধ্যে তানোর ও গোদাগাড়ীও আছে।

পানি সংকটাপন্ন এলাকা হলো এমন অঞ্চল যেখানে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে তা আরও বাড়ছে। বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর অধীনে, এই ধরনের এলাকাগুলো সরকার কর্তৃক চিহ্নিত করা হয় এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার ও সংরক্ষণে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।

এক জরিপের ভিত্তিতে নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচল ও গোমস্তাপুরকে পুরোপুরি পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ও ডাসকো কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, এ জরিপের ভিত্তিতে নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাঁচল ও গোমস্তাপুরকে পুরোপুরি পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও ভোলাহাট, চট্টগ্রামের পটিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলকে আংশিক পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওয়ারপোর নীতিমালার আলোকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এসব এলাকায় পানি রেশনিং করেছে। গত ২৫ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ নির্বাহী কমিটি এলাকাগুলোকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) কর্মকর্তা আল আমিন কবীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তানোরে পানির স্তর কেন নামছে এই বিষয়ে গবেষকেরা বলেন, তানোর ও গোদাগাড়ীকে উঁচু বরেন্দ্রভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তানোর উপজেলা সদরের উচ্চতা ২৫ মিটার ও গোদাগাড়ীর উচ্চতা ২০ মিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু এলাকা উচ্চাডাঙ্গা গ্রামটি তানোরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর উচ্চতা ৫২ মিটার।

বিএমডিএ বলছে, চলতি বছর তানোর ও গোদাগাড়ীতে বৃষ্টি হয়েছে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গোদাগাড়ীতে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬১৫ মিলিমিটার। এ বছর সেখানে হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ মিলিমিটার। একই সময়ে তানোরে ২০১৫ সালে বৃষ্টি হয়েছিল ১ হাজার ৩০৭ মিলিমিটার, আর চলতি বছর হয়েছে ১ হাজার ১৫৬ মিলিমিটার। ২০১৫ সালের পর এই ১০ বছরে উভয়স্থানেই চলতি বছর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

রাজশাহীর এসব এলাকায় পানি সুশাসন নিয়ে গবেষণা করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রাজ্জাকুল ইসলাম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তানোরের ভূমির গঠন একটু ভিন্ন। এখানকার ভূমি ঢালু। পানি দাঁড়াতে পারে না। ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত মাটির নিচে মিহি কাঁদার স্তর আছে। পানি নামতে সময় লাগে। এ ছাড়া অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং পরের বছর পুনর্ভরণ না হওয়ার কারণে অ্যাকুইফার মারা গিয়েও এমন হতে পারে।

বন্ধ শুধু গভীর নলকূপ আর সাবমার্সেবল পাম্পই নয়,ভূগর্ভস্থর তলদেশের পানির স্তর পরিমাপ কূপ মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়নে একটি করে অনেক গভীরতায় বসানো ছিল,সে পরিমাপ কূপ দুইটিওপানি শূন্যে বন্ধ হয়ে অকেজো হয়ে গেছে।

চৈত্রের ধুধু খড়ায় কমে গেছে খাল-বিলের পানি। শুকনো হয়ে পড়েছে অনেক পুকুরও। এমন অবস্থায় বরেন্দ্র অঞ্চলের উচুঁ অঞ্চল গুলোতে খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। বরেন্দ্র অঞ্চলে অদুর ভবিষ্যতে পানির চরম সংকট দেখা দিবে। এধরনের সমস্যার কথা অনেক আগে থেকেই পরিবেশবাদিরা বলে আসছিলেন। ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার বিগত এক যুগে দ্বিগুনের বেশি নিচে গেছে। গবেষকদের কথা আজ বাস্তবে রুপ নিতে শুরু করেছে।

২০১৪ সাল থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪টি পৌরসভা ও ৩৫ ইউনিয়নকে অতি ঝুঁকিপুর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পর থেকেই এসব ঝুঁকিপুর্ণ অঞ্চল গুলোতে প্রায় ৪৮ টি কূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থর পানি স্তরের নিয়মিত পরিমাপ করে আসছেন ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম) নামে একটি জরিপ সংস্থা।

সংস্থাটি সর্বশেষ ২০১৮ সালে মার্চ মাসের ঝুঁকিপুর্ণ এলাকায় ৪৮ টি পরিমাপ কূপ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের মাপ গ্রহন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তানোরের মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়ন এবং গোমাস্তপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নে দ্রুত গতিতে পানি নেমে যাচ্ছে। ফলে এ দুই ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ভূ-তত্ব ত্ত খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। বরেন্দ্রে অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে গবেষণা করছেন।

ড.চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান,বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামাই চিন্তিত গবেষকেরা। কারণ নিচে পানি শূণ্য হলে বালি,পাথর ফাকা হয়ে পড়বে। তাতে করে সামান্য ভূমিকম্প হলেই দেবে যেতে পারে।

এ গবেষক আরো বলেন,বরেন্দ্র অঞ্চল কে বাচাতে পানির কোন বিকল্প না। প্রথমেই ভূ-গর্ভস্থ থেকে সেচ কাজে পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর-খাড়ি বেশি করে খনন করতে হবে। বাসা বাড়ির ছাদের পানি ভূ-গর্ভস্থ ভিতরে রিফানিং করে ঢুকাতে হবে। এক কথায় বৃষ্টির পানি বেশি বেশি রির্চাজ করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের কৃষক,শিক্ষক,ঈমামগণ ও সচেতন ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। তার আগে সরকারকে এসব অঞ্চলের কৃষি জমিতে সেচ দিতে বিকল্প উপায়ে পানির ব্যবস্থা করতে পারলেই সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হবে বলে মনে হয়।

মুন্ডমালা পৌর সভার সাবেক মেয়র সাইদুর রহমান বলেন, এ এলাকার প্রধান সমস্যা এখন সেচ ও খাবার পানি। একের পর এক সাবমার্সেবল নলকূপ বসিয়েও পানি সংকট সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র দুই বছর আগে বসানো সাবমার্সেবল পাম্পগুলো পানির অভাবে একের পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।। চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই পুকুরের পানি তলানিতে। তবুও পচা দুর্গন্ধ। এখন গ্রামবাসীর খাওয়ার পানির ভরসা একব্যাক্তির বাড়িতে বসানো একইঞ্চি পাইবের সাবমার্সেবল পাম্প। তাও পানির অভবে বন্ধ হতে শুরু করেছে।

বাধাইড় ইউপি চেয়াম্যান আতাউর রহমান বলেন,তার ইউনিয়নে ১৫০টি মত সাবমার্সেবল পাম্প দিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক পাম্প তলদেশে পানি না থাকায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এতে ইউনিয়ন বাসীর খাওয়ার পানি চরম দুর্ভোগে পড়ে আছে।

অনেক পুকুর শুকিয়ে চৈৗচির হয়ে গেছে। গরু-ছাগল,হাড়িপাতিল মাজা ঘোষা সবই করতে হচ্ছে দুরদুরান্ত থেকে কেনা আনা পানিতেই। যার ফলে গ্রামে এখন চলছে পানির হাহাকার।

তিনি আরো বলেন,বোরো মৌসুমে বেশি মাত্রায় পানি ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে দুই ফুট করে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এমনটি হওয়ার কারণে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এর বরেন্দ্র অঞ্চলে দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী প্রজেক্টর জাহাঙ্গীর আলম খাঁন জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ থেকে অতিরিক্ত মিঠাপানি উত্তোলনের ফলে ক্রমাগতভাবে পানির স্তর নিচে নামছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষক রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, ১৯৮০ সালে এ অঞ্চলে পানির স্তর মাত্র ৩৯ ফুট নিচে ছিল। তবে ৩৬ বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে ১১৮ ফুট নিচে নেমে গেছে। ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটা পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, দেশের গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার হলেও এ এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতে ভূগর্ভস্থ পানির গড় পুনর্ভরণের হার দেশে ২৫ শতাংশ হলেও এ অঞ্চলে মাত্র ৮ শতাংশ।