স্মৃতির জানালায় প্রিয় শিক্ষিকা নাজু আপা

9
তাহমিদুর রহমান তুষার :
মানুষের সবচেয়ে সুন্দর আনন্দঘন সময় কাটে শৈশবে। কিন্তু শৈশব কাল যখন অতীত হয়ে যায় তখনই তা উপলব্ধিতে আসে। শৈশবের স্মৃতির পাতা যখন চোখের সামনে মেলে ধরে, আলো আঁধারীর খেলায় ঢাকা পড়ে যায় অনেক ক্ষণ।
সময়ের স্রোত আর জীবনের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততায় কখন যেন অনেক দূরের স্মৃতি হয়ে যায় আমাদের শৈশব কৈশোর। সেই স্মৃতির অপরিহার্য অংশ আমাদের স্কুল জীবন আর  শিক্ষক,শিক্ষিকা।যখন মনের আনন্দে উপভোগ করেছি দূরন্ত সোনালী শৈশব কৈশোর, তখন পরম যত্নে আমার জীবন ও মনন গড়নে ব্যস্ত শিক্ষিকা নাজু ফুপু।
আমার শৈশব কেটেছে পাকশী পাইলট পাড়ায়।২২টি বাসা নিয়ে একটা কলোনি। আর এক ঝাঁক দস্যি ছেলে মেয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতো। আমি তাদেরই একজন ছিলাম। আমার বাসার পিছনে ছিলো নাজু ফুপুর বাসা। তিনি ছিলেন শফি আহমেদ প্রিপারেটরী স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা।
স্মৃতিতে অস্পষ্ট হলেও আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে, আমার প্রথম পাঠের স্মৃতি। নাজু ফুপুর পাইলট পাড়ার টি/৩৫৪ নম্বর বাসার বারান্দায় বসে  অ-তে অজগরঃ অজগরটি আসছে তেরে, আমটি আমি খাবো পেরে ইত্যাদি।
অতঃপর কোন একদিন বৃহৎ ধারাপাত, আদশলিপি ও বানান শিক্ষার সঙ্গে সদ্য কেনা স্লেট নিয়ে নাজু ফুপুর সঙ্গে শফি আহমেদ প্রিপারেটরী স্কুলে গিয়েছি। বেবি শ্রেনীতে ভর্তি করা হলো।  ক্লাস ছুটি হলেও স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত ফুপু লাইব্রেরীতে বসিয়ে রাখতেন। স্কুল ছুটি শেষে আমার হাত ধরে পাইলট লাইন এর পাশের রাস্তা দিয়ে বাসায় নিয়ে আসতেন। সকল শিক্ষক/ শিক্ষিকাকে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়ার যে রেওয়াজ তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন।
তিনিই আমার শিক্ষাএী, শিক্ষা গুরু নাজু ফুপু। তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পাকশীর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শাহিদা আরজুমান্দ বানু  নাজু আপা(আমি ফুপু ডাকি শৈশব থেকে) উল্লেখ ১৯৮৫ সালে চন্দ্র প্রভা ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রেলওয়ে করন করা হলে শফি আহমেদ প্রিপারেটরি স্কুল বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গে একএিত করা হয় এবং  তিনি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা নিযুক্ত  হন এবং ১৯৮৮সালে বদলি হয়ে চন্দ্র প্রভা বিদ্যাপীঠে চলে  আসেন।
তিনি ছাত্র ছাত্রীদের সবসময় সত্যের পথে,  ন্যায়ের সাথে চলতে পরামর্শ দিতেন।  ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে তিনি তাদের উৎসাহ দিতেন সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে। সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতেন এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি করেন। যার ফলে ছাত্রছাত্রীরা যেকোনো সমস্যায় তার কাছে চলে আসতেন এবং তিনি তা খুব সহজ উপায়ে সমাধান করে দিতেন।ছাত্র ছাত্রীদের এমন ভাবে পড়াতেন, তারা বিষয়টিকে খুব সহজই গ্রহণ করতে পারতোএবং কোনো ধরনের বিরক্ত লাগতো না। তাই তিনি পড়ানোর মাধ্যমটিকে আনন্দময় করে তুলতেন।
তিনি তার সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে  আদর্শ থেকে একচুলও পিছপা হননি। কেবলই টাকা ওয়ালা ক্ষমতা কেন্দ্রিক লোকদের কাছে টানেননি কোনদিন। ছাত্র ছাএীদের সামনে তিনি হাজির করতেন এলাকার সত্যিকার গুণীজনদের।পাশে বসাতেন কর্মক্ষেত্রে সফল, স্কুলের প্রাক্তন আদর্শ ছাত্র ছাএীদের। যাতে ছাত্র ছাএীরা তাদের দেখে লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহিত হয়। সত্যিকার মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার বাসনা তীব্র হয় মনে।  তিনি ছাত্র ছাএীদের প্রতিভা বিকশিত করতে,তাদের জ্ঞানের রাজ্য সম্প্রসারণে, তাদের অন্তরাত্মাকে আলোকিত করতে সদা সচেষ্ট থাকতেন। অন্যায্য চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হীনমন্যতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
সেকারণেই তিনি কেবল শিক্ষিকাই ছিলেন না, ছিলেন আদর্শ শিক্ষিকা। ছিলেন  বাতিঘর, গাইড, রোলমডেল। আজকের ক্ষয়িষ্ণু সমাজে সেই আদর্শবান শিক্ষিকাদের বড় প্রয়োজন। মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত অসুস্থ প্রতিযোগিতার অশুভ কালো থাবার করাল গ্রাস থেকে ছাত্র ছাত্রী তথা দেশ মাতৃকার আগামী দিনের চালকদের রক্ষা করতে আজ সাহসী, গুণী, আদর্শ শিক্ষকের বিকল্প নেই।
জ্ঞান নির্ভর আলোকিত সমাজ ও জাতি বিনির্মানে ভীষণ প্রয়োজন নাজু ফুপু  মতো সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর।
আমার শিক্ষার বাতিঘর নাজু ফুপুর  প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা,অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো আল্লাহতালা তাকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন।
লেখক: তাহমিদুর রহমান তুষার, শফি আহমেদ প্রিপারেটরী স্কুল ১৯৮৩, চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ ১৯৯২, ১৩.০৯.২০২১।
Comments
[covid19 country="Bangladesh" title="Bangladesh"]