সরকারি নির্দেশনা মানছে না ঢাকার দুই সিটি

17

ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারে সরকারি নির্দেশনা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মানছে না। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এ ব্লক ব্যবহার শুরু করলেও দুই সিটি এখনো কংক্রিট ব্লককে রেট শিডিউলভুক্তই করেনি। ফলে নির্মাতা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পোড়া ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে পারছে না।

উন্নয়ন কাজে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে দুই বছর আগে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের মধ্যে সব সরকারি উন্নয়ন কাজে শতভাগ কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়। সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ব্লকের ব্যবহার বৃদ্ধি না পাওয়ায় সারা দেশে পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটার কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলছে।

বর্তমানে সাত হাজার ৯০২টি ইটভাটা সচল রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে তিন হাজার ২০০টি ইটভাটা অবৈধ। এসব ভাটায় বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি হিসাবে অসংখ্য গাছপালা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবছর গাছপালা নিধনও বাড়ছে। এছাড়া ইট পোড়াতে নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করায় মারাত্মক বায়ুদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে আবাসিক এলাকায়ও ইটভাটা গড়ে উঠছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার শুরু করেছে। দুই বছর পার হলেও ব্লক ব্যবহারের ব্যাপারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন উদাসীন। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। নির্মাতা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারে আগ্রহ দেখালেও দুই সিটি কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায় কিছুই করতে পারছে না।

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশের ইটভাটাগুলোয় প্রতিবছর ২০ লাখ টন জ্বালানি কাঠ ও ২০ লাখ টন কয়লা পোড়ানো হয়। এ হিসাবে এখান থেকে বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হয়। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা মনে করেন, দেশে পোড়া ইটের কোনো প্রয়োজন নেই। নদী থেকে ড্রেজিং করে যে বালু ও মাটি উত্তোলন হয়, তা দিয়েই পোড়া ইটের বিকল্প ব্লকের চাহিদা শতভাগ পূরণ করা সম্ভব।

২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)-এর ধারা ৫ (৩ক)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মাটির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে হ্রাস করার উদ্দেশ্যে সব সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে পোড়া ইটের পরিবর্তে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে হবে। ভবনের দেওয়াল ও সীমানাপ্রাচীর, হেরিং বোন বন্ড সড়ক এবং গ্রামীণ সড়ক টাইপ ‘বি’-এর ক্ষেত্রে পোড়া ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে ওই আইনের ২ নম্বর উপধারায় বর্ণিত ব্লক ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।’

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বছরভিত্তিক ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ ভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ ভাগ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ ভাগ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০ ভাগ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ ভাগ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০০ ভাগ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, ‘কোনো সরকারি উন্নয়নে কোনোরূপ ব্যত্যয় বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ’-এর নির্বাহী পরিচলক মোহাম্মদ আবু সাদেক বলেন, পোড়া ইট পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য সরকার পোড়া ইটের বিকল্প হিসাবে ব্লকের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে আইনও পাশ হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী ২০২৫ সালে সরকারি সব কাজে ব্লক ব্যবহার করার কথা। এ বছর জুনের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩০ শতাংশ ব্লক ব্যবহার করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কত শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেক স্বায়ত্তশাসিত বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান এ প্রজ্ঞাপনের আওতামুক্ত বলে মনে করছে। তবে এটা তাদের ভুল ধারণা। কেননা যে উন্নয়নে সরকারি অর্থ খরচ হবে, সেটাই সরকারি উন্নয়ন। সেখানে এটা মেনে চলতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, পোড়া ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এটা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিতসহ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা সব কাজে মেনে চলতে হবে। এক্ষেত্রে ডিএসসিসি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ডিএসসিসির উন্নয়ন কাজে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার হচ্ছে কি না, এ ব্যাপারে আমার পরিষ্কার জানা নেই। কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে ডিএসসিসি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, পরিবেশ ও প্রতিবেশের সুরক্ষার কথা ভেবে সরকার কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি উন্নয়ন কাজে পোড়া ইট ব্যবহার না করে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এটা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন কাজে মেনে চলতে হবে। তিনি আরও বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এটা মানছে কি না, সেটা আমার জানা নেই। আমি খবর নিয়ে দেখব। তারা এটা বাস্তবায়নে অনাগ্রহ দেখালে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু সিটি করপোরেশন নয়, পৌরসভা, জেলা, উপজেলাসহ সব ক্ষেত্রে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে তৎপরতা চালাতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধে আমরাও একমত। এটা করলে দূষণ কমবে এবং ফসলি জমির উর্বরতা রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, ডিএনসিসিতে এ ধরনের পোড়া ইটের ব্যবহার অনেকাংশে কম। এরপরও যেটুকু রয়েছে, সেটুকু বন্ধেও আমরা কার্যকর উদ্যোগ নেব। তিনি আরও বলেন, এতদিন ডিএনসিসি থেকে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, এটা সত্য। তবে পোড়া ইটের বিকল্প হিসাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার এখন সেটা নেওয়া হবে। উন্নয়ন কাজে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করলে ইট তৈরিতেও আগ্রহ কমবে।

Comments
[covid19 country="Bangladesh" title="Bangladesh"]