প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী হলে তারা বিদেশে ধর্ণা দিতেন না

59

ডা. এস. এ. মালেক:

গত রাতে প্রফেসর আসিফ নজরুলের একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম তিনি তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বাংলাদেশ র‌্যাব এবং পুলিশের যে কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তার স্বপক্ষে প্রকারান্তরে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তার ভাষায় আমেরিকা একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশ। তার সাথে বাংলাদেশ যদি সঠিক সম্পর্ক রক্ষা না করে তাহলে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য শক্তিধর সব দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে।

যে ধরনের চিন্তার বশবর্তী হয়ে তিনি একথা বলেছিলেন সেই চিন্তা ধারা বাংলাদেশের একজন শিক্ষিত ব্যক্তির হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ-আমেরিকা সাথে বন্ধুত্ব চাই এ কথা সত্য। সিআইয়ের যোগসাজশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, তারপরও বাংলাদেশ আমেরিকার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের এর সর্বোচ্চ রপ্তানি আমেরিকার বাজারে হয়ে থাকে। আমেরিকার অনেকেই ইনভেস্ট করেছেন এদেশে। আমেরিকান অয়েল কোম্পানীগুলো বিডের মাধ্যমে এখানে কাজ না পাওয়া সত্বেও বাংলাদেশে কিভাবে তাদেরকে কাজ দিয়েছিল তা বোধকরি অনেকেরই জানা আছে।

এসব কিছুই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার সাথে একটি পারস্পরিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু আসিফ নজরুল সাহেবের ভাষায় এই সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কেননা বাংলাদেশ তার দল বিএনপি এবং তার স্বপক্ষের শক্তিসমূহ গণতন্ত্রের সংগ্রাম করছেন। সেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তারা এখন দেশের অভ্যন্তরে ব্যর্থ হয়ে বিদেশী প্রভূদের দ্বারস্থ হয়েছেন।

বিশেষ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজের তথাকথিত প্রতিনিধিদের নাম বলতে চাই না, কেননা তারা এদেশে এতোই পরিচিত যে সবাই তাদেরকে চিনে এবং জানে। মানুষ এও জানে যে, বাংলাদেশের কোন ব্যক্তি, কোন নোবেল লরিয়েট আমেরিকান প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে একাধিকবার ঘুষ দিয়েছেন এবং এই কাজে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ তিনি একটি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার করেছেন ।
আত্মস্বীকৃত আরো কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন তারা ভাত খান বাংলাদেশ কিন্তু কুলি ফেলেন আমেরিকায়। এরকম বুদ্ধিজীবীগণ এদেশে মাঝে মাঝে সাইবেরিয়ান ডাকস এর মতো জন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

দেশে যখনই কোন সংকট দেখা দেয় তখনই তাদের আবির্ভাব ঘটে এবং তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তারা এটা জানেন না যে, বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিভাবে সুসংহত করতে হয়। বাংলাদেশে যে একটি Sub-Servient রাষ্ট্র নয়, এদেশ যে কারো করুনা বা দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে চলে না, বা কারো অঙ্গরাজ্য নয়। সুতরাং কারো অনুকম্পা নিয়ে যে বাংলাদেশ চলে না, একথা তারা মাঝে মাঝে বিস্মৃত হয়ে যান বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের এখন একটা শক্তিশালী অর্থনীতি আছে, নিজস্ব কৃষ্টি, সাহিত্য-সংস্কৃতি রাজনীতি আছে, প্রশাসন আছে, সংসদ আছে, আইন-কানুন আছে, সরকার আছে, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী চলে কিন্তু আজকে আসিফ নজরুলের কথায় মনে হয় যে বাংলাদেশ একটি পরনির্ভরশীল দেশ এবং আমেরিকার অনুকম্পা ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না এমনটাই তার/তাদের অভিমত।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আছে কিনা সেটা নির্ধারণ করবে এদেশের আপামর জনসাধারণ সেক্ষেত্রে বাইরের যে পারসেপশন সেটা কোন কাজে আসবে না। বাইরে তো অনেক ধরনের পারসেপশন হয়ে থাকে। একটা দেশের স্বার্থে যখন আঘাত লাগে তখনই এক ধরণের সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী দেশের বিরূদ্ধে অপতৎপরতায় লিপ্ত হন। বাংলাদেশের সাথে চীনের যে নৈকট্য তা আমেরিকা তথা অনেক রাষ্ট্রেরই পছন্দ নাও হতে পারে এবং সে কারণেই তারা এ বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনা বা নাও দেখতে পারেন।

কিন্তু বাংলাদেশে তার স্বার্থে আজকে চিন থেকে যে প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে, যে অর্থসহায়তা পেয়েছে, যে সহযোগিতা পাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মেগা প্রজেক্ট এর অন্যতম সহযোগী হিসেবে চীন এবং চীনের কোম্পানিগুলো, সেদেশের প্রকৌশলীগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন তা কি তারা অস্বীকার করতে পারবেন? একথা ঠিক চীনের বিপরীতে কোন চুক্তিতে বাংলাদেশ সরাসরি যেতে পারে না।

তাছাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি হচ্ছে “Friendship towards all and malice towards none”. বিশ্বের বৃহত্তম শক্তি বলয়ের ভারসাম্যের যে দ্বন্দ্ব বিভিন্ন জায়গায় বিরাজমান, বিশেষ করে এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়নে বাংলাদেশকে জড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়, উচিতও হবে না। তাই সব ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকার সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। এতে কারো ক্ষুব্দ হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই, থাকা উচিতও নয়।

আমরা অতীতেও দেখেছি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে বৃহৎ শক্তি তার ইন্টারেস্ট ফুলফিল করতে পারেনি, সেখানে সেই দেশের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। বাংলাদেশে কারা সরকার পরিচালনা করছে? গণতান্ত্রিক সরকার না অগণতান্ত্রিক সরকার? এখানে ন্যায়-নীতির শাসন, আইনের শাসন বিদ্যমান আছে কিনা? তার বিচার বাংলাদেশের জনগণ করবে।

বাংলাদেশের মানুষ, অন্য কোনো দেশ আমাদেরকে কি ধরনের সার্টিফিকেট দিল বা না দিল তাতে কোনো এসে যায়না। যদিও আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব চাই। আমেরিকার সাথে যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে আমরা চাই তার আশু সমাধান। আমরা চাই দেশে সত্যিই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার বিচার করবে। তার জন্য অসৎভাবে কারো নাক গলানো দরকার হবে না এবং এ দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বাইরের প্রভূদের কাছে ধর্ণা দেওয়ারও প্রয়োজন হবে না। আমরা আশা করব, আসিফ নজরুলের মতো এমন একজন শিক্ষিত বিবেকবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে কথা বলবেন।

সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ
(লেখক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক গবেষক)

Comments
[covid19 country="Bangladesh" title="Bangladesh"]