ঢাবি সিনেট নির্বাচন: লড়াইয়ে এগিয়ে নীল দল

11

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামীকাল। এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল এবং বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এই নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১ হাজার ৪৭০ জন শিক্ষক ভোট দিবেন। এদিকে, শিক্ষকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি সম্পর্কিত ১২ ইশতেহার নিয়ে ভোটারদের মাঝে যাচ্ছেন নীল দলের প্রতিনিধিরা। তবে, নির্বাচনি প্রচারণায় ভোটারদের মাঝে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সাদা দলের প্রার্র্থীরা।

আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে নীল এবং সাদা দলে ৩৫ জন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উভয় দলই গ্রুপভিত্তিক এবং ব্যক্তিগতভাবে ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। এছাড়া, বিভিন্ন অনুষদের অন্তর্গত বিভাগগুলোতে গিয়েও ভোটারদের মধ্যেও প্রচারপত্র পৌঁছিয়ে দেওয়ার কথা জানান প্রার্থীরা। এক্ষেত্রে উভয় দল নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সমুন্নত রাখা, শিক্ষা সম্প্রসারণ ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণসহ সব ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। এজন্য এই নির্বাচনে একাডেমিক ক্ষেত্রে সুনাম এবং প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নীল দল থেকে মনোনয়ন করা হয়েছে বলে জানান নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ। এই সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতেই সেই লক্ষ্যে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করেছে দলটি। এসবগুলোর মধ্যে- বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ মর্যাদা এবং স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নিশ্চিত করা; বিনা/স্বল্প সুদে শিক্ষকদের জন্য গাড়ি ক্রয় ঋণের ব্যবস্থা; গবেষণা অনুদান প্রবর্তন করাসহ গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা; সকল প্রশাসনিক দায়িত্ব¡ পালন ও পরীক্ষাসংক্রান্ত ভাতা বৃদ্ধি; প্রত্যেক শিক্ষকের শিক্ষাউপকরণ ব্যয় বহনের জন্য অর্থ বরাদ্দ; শিক্ষকদের চিকিৎসা ছুটি অনুমোদনের ব্যবস্থা; প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার দিন থেকে শিক্ষকদের পদোন্নতি কার্যকর; হাই-ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ হলে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা; বিশ্ববিদ্যালয়ের র?্যাংকিং বৃদ্ধিতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন; শিক্ষকদের বরাদ্দকৃত বাসা-সংস্কার ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে বহন করার ব্যবস্থা; বঙ্গবন্ধু ওভারসিজ স্কলারশিপের আওতায় শিক্ষকদের জন্য ওভারসিজ পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপের ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রবন্ধ গৃহীত হওয়া সাপেক্ষে বছরে অন্তত দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য যাবতীয় ব্যয়ভার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বহনের ব্যবস্থা করা।

এ বিষয়ে নীল দল থেকে মনোনীত প্রার্থী ও শিক্ষক সমিতির সদস্য অধ্যাপক ড. এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, নীল দল সবসময় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের চেতনাকে দৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর। আমরা সিনেট নির্বাচনে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সমুন্নত রাখা, শিক্ষা সম্প্রসারণ ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করব। সেভাবেই আমরা ইশতেহার ঠিক করেছি। নীল দলের আরেক প্রার্থী শিক্ষক সমিতির যুগ্মণ্ডসম্পাদক অধ্যাপক ড. আব্দুর রহিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি নীল দল সবসময় শিক্ষকদের জন্যই কাজ করে। আমরা এবারও শিক্ষকদের সব দিক থেকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাব। শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও নীল দল মনোনীত সিনেট প্রার্থী অধ্যাপক ড. আকরাম হোসেন বলেন, আমাদের ইশতেহারে শিক্ষার গুণগত মানের বিষয়ে বলা হয়েছে। এবং শিক্ষকদের গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। তাদের এই সুযোগ-সুবিধা দিলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে। আমরা এই ইশতেহার নিয়েই ভোটারদের মাঝে যাচ্ছি। অন্যদিকে, সাতটি ইশতেহার নিয়ে ভোটারদের মাঝে যাচ্ছেন সাদা দলের প্রার্থীরা। তাদের ইশতেহারগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদেশের সব ধরনের অপব্যবহার রোধ করে একে সমুন্নত রাখা; জাতীয় বেতন কাঠামোতে সর্বোচ্চতর শিক্ষকদের জন্য নিশ্চিত করা এবং মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার স্বার্থে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা; শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ ৬৫ থেকে ৬৭ বছরে উন্নীত করার দাবির ব্যাপারে অনড় থাকা; শিক্ষকদের সময়মতো পদোন্নতির ব্যাপারে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা; বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে শিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা; অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একাডেমিক সম্প্রসারণ অপেক্ষা একবিংশ শতকের চাহিদা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বারোপ এবং সর্বোপরি ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে মুক্ত মনে শিক্ষকদের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিশ্চিতকরণকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।

সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান বলেন, আমরা পূর্ণাঙ্গ প্যানেলকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। সেভাবেই আমরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। তারাও আমাদের ভালোভাবেই সাড়া দিচ্ছেন। আমাদের প্যানেলের সদস্যরাও পরিশ্রম করছেন। আমাদের এজেন্ডা নিয়েই আমরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে সাদা দলের যুগ্ম অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, সিনেট নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। যদিও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার দুই বছর পর আমরা শিক্ষকদের কাছে ইশতেহার পৌঁছে দিয়েছি। আমরা সাদা দল থেকে সবগুলো বিভাগে প্রচারপত্র পৌঁছে দিয়েছি। আমরা ব্যক্তিগত এবং দলবদ্ধভাবে নির্বাচনি প্রচারে সব শিক্ষকদের কাছে যাচ্ছি। সাদা দলকে বিজয়ী করার জন্য আমরা আমাদের যুক্তি তুলে ধরছি। আমরা নির্বাচনে জেতার জন্য আশাবাদী।

তিনি অভিযোগ করেন, তরুণ শিক্ষকদের প্রশাসন সমর্থক প্রার্থীদের থেকে চাপ দেওয়া হয়। শিক্ষকদের বিভিন্ন গ্রুপে আবার প্রজেকশন মিটিংয়ের নামে ডেকে তাদের চাপ দেওয়া হয়। প্রশাসনের শীর্ষ মহল থেকেও ফোন করে বা অন্যভাবে চাপ দেওয়া হয়। এমনকি ভোট দেওয়ার পর সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য মোবাইলে ছবি তুলে দেখানোর জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়। আমরা এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনারকে বলেছি। তিনি এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন বলে আমাদের নিশ্চিত করেন।

যদিও অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, তারা যদি এমন অভিযোগ করে থাকে তবে সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা আমাদের ইশতেহার নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে যাচ্ছি। তারা আমাদের সর্বোচ্চ সমর্থন দিচ্ছেন।

সার্বিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচনে নীল ও সাদা দল থেকে মোট ৭০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আমার কাছে তিনজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ আসছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কোনো অভিযোগের প্রমাণ পায়নি। এজন্য তাদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনি কোনো বাঁধা নেই। এছাড়া অন্য কোনো ধরনের অভিযোগ আসেনি। আমরা নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ সিনেট নির্বাচন হয়েছিল ২০১৭ সালের ২২ মে। এতে আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ৩৩ ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের দুইজন জয়ী হন।

Comments
[covid19 country="Bangladesh" title="Bangladesh"]