ঢাবি ভিসিকে দেওয়া বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মিথ্যা তথ্যে ফাঁসলেন শিক্ষক

51

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে একটি পদে স্টোর-কিপার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। এই নিয়োগে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছতার অভিযোগ আনেন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন। পরবর্তীতে একাডেমিক কমিটির সভায় ওই শিক্ষককে নিয়োগ কমিটি থেকে বাদ দিয়ে নতুন করে নিয়োগ কমিটি প্রস্তাব করা হয়। এমন সিদ্ধান্ত জানিয়ে সেই কমিটি অনুমোদনের জন্য ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে চিঠি দেন বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন। এই চিঠির সত্যতার ব্যাপারে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, একাডেমিক কমিটির সভায় এমন কোন সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়নি। বরং ভিসিকে দেওয়া মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ কমিটি থেকে অধ্যাপক রেজাউল করিমকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, গত বছরের ১৩ই অক্টোবর একটি স্টোর-কিপার নিয়োগে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. রেজাউল করিমসহ মোট পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে গত ১৯ জানুয়ারির নিয়োগ সংক্রান্ত সিএন্ডডি কমিটির সভায় ২ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

যদিও সেই নিয়োগ স্থগিত করে বিভাগের চেয়ারম্যান। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক কমিটির সভায় অধ্যাপক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে স্টোর-কিপার নিয়োগ পদে প্রার্থীদের নামের তালিকা বিভাগীয় প্রধানকে না জানিয়ে নিয়েছেন বলে সেই নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামাল উদ্দিন। পরে তার বিরুদ্ধে বিশ^বিদ্যালয়ের বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নেন। যদিও ওই সভায় ৮জন শিক্ষক এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেন।

এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারির সিএন্ডডি কমিটির সভায় অধ্যাপক রেজাউল করিমের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোন সমাধান না আসা পর্যন্ত ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে এবং নিয়োগ কমিটিও পুনর্গঠিত হবে না’ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি সভায় উপস্থিত দুইজন শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন। এরপর ২ মার্চ ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে দেওয়া একটি চিঠি দেন বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন। সেখানে তিনি নিয়োগ কমিটি থেকে রেজাউল করিমকে বাদ দিয়ে নতুন একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন।

ওই চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৩ ফেব্রুয়ারির একাডেমিক কমিটির সভায় ১৭ জন সদস্যের মধ্যে ৬জন শিক্ষক দ্বিমত পোষণ করেন। যদিও সভা সূত্র জানায়, সেখানে উপস্থিত ৮জন শিক্ষক দ্বিমত পোষণ করেন। ভিসিকে দেওয়া ওই চিঠিকে ‘মিথ্যা এবং প্রতারণামূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সভায় উপস্থিত এক অধ্যাপক বলেন, সভায় ৩ ফেব্রুয়ারি একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে অধ্যাপক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখা হবে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোন সমাধান না আসা পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে এবং কমিটিও পুনর্গঠন হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিভাগের চেয়ারম্যান যদি চিঠিতে এটি উল্লেখ না করে ভিন্ন কিছু লেখেন তবে সেটি মিথ্যা।

এদিকে, ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে দেওয়া ওই চিঠির প্রেক্ষিতে গত ১৭ এপ্রিল নিয়োগ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আগামী ১৪ মে সেই নিয়োগ পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করেন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামাল উদ্দিন।

নিয়োগ স্থগিতাদেশ দিল হাইকোর্ট: এদিকে, বিভাগের এই নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি জাফর আহমেদ এবং কাজী জিনাত হক গত ২৭ এপ্রিল এই স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, অধ্যাপক রেজাউল করিম গত ৩ মার্চ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি দেন। যা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। এরফলে তিনি চিঠি দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এবং ন্যায় বিচারের জন্য আদালতের দারস্ত হয়েছেন। এজন্য আদালত পুনর্গঠিত অবৈধ নিয়োগ কমিটি বাতিল, ১৪ মে নিয়োগ প্রক্রীয়া স্থগিত এবং দুর্নীতি সম্পর্কে অধ্যাপক রেজাউল করিমের দাবি তদন্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আদেশ করা হলো।

নিয়োগ কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক ড. এ. কে. এম রেজাউল করিম বলেন, আমার কাছে নিয়োগের আবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের বাইরে একজনকে সুযোগ করে দেওয়ার তথ্য আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা আবেদন করেছেন তাদের তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। যেটা কমিটির সদস্য হিসেবে আমার বেআইনি কিছু না। কিন্তু পরবর্তীতে বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন নিজ প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে সমস্যা হবে এজন্য আমার ব্যাপারে মিথ্যা অভিযোগ এনে ভিসিকে চিঠি দিয়েছেন। পরে আমি ভিসিকে তার চিঠির প্রেক্ষিতে আরেকটি চিঠি দেই। তিনি আমার চিঠির কোন উত্তর দেননি।

অভিযোগের ব্যাপারে মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিম যে অভিযোগ দিয়েছে তা মিথ্যা এবং বানোয়াট। তিনি আমাকে না জানিয়ে নিয়োগে প্রার্থীদের নামের তালিকা নিয়ে নিয়েছেন। পরে তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এজন্য একাডেমিক কমিটি তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি নিয়োগ কমিটিতে থাকলে এক হাজার টাকা পেতেন অথচ লাখ টাকা খরচ করে তিনি হাইকোর্টে গেছেন।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, হাইকোর্ট থেকে কোন নির্দেশনা এখনো আমার কাছে আসেনি। আসলে বলতে পারবো। এর আগে বিভাগে নিয়োগের জন্য গঠিত একটি কমিটির একজন সদস্য পরিবর্তনের জন্য আমার কাছে চিঠি আসছিল। যেহেতু সেটা একটি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত ছিল এজন্য আমি সেই অনুযায়ীই কাজ করেছি।

Comments
[covid19 country="Bangladesh" title="Bangladesh"]