করোনা সংক্রমণের চতুর্থ মাস: উচ্চ সংক্রমণের আশংকা এবং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা

350

মোঃ মহিবুল হক খান:

এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কার মাঝে সারা দুনিয়ার মানুষেরা আজ দুরতম সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে দিন গুনছে। আর সেই সম্ভাবনাকে সত্যি করে তুলবার প্রতিশ্রুতিতে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন এই গ্রহের সেরা বিজ্ঞানীরা। তারা সফল হবেন নিশ্চিত, পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই সফলতার বিন্দুটিতে পৌছাতে লাগবে বেশ কিছু সময়। সেই সময়টুকুতে নিজেদের নাগরিকদের সুস্থ রাখবার জন্য সামাজিক দূরত্ব আর লকডাউন কে অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করেছে রাষ্ট্রগুলি। এই গৃহবন্দীত্বের বড় মাশুল গুনতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি – রাষ্ট্রনীতি। কিন্তু নাগরিকরা বেচে থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো যাবে আবার একসাথে – এই মন্ত্রেই বোধকরি দেশগুলি একাট্টা।

একই বাস্তবতায় বাংলাদেশও অভিন্ন নয়। মার্চের প্রথম সঙ্ক্রমণের পর তিন মাস পেরিয়ে বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে সংক্রমণ সংক্রান্ত সবগুলি মেট্রিক উর্ধগামী। শুধু উর্ধমুখী তাই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলির তুলনায় শতকরা হিসেবেও আশঙ্কা জাগানোর জন্য যথেষ্ট। জুনের ৯ তারিখ পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৭১ হাজারের বেশি এবং মৃতের সংখ্যা হাজার ছুঁই ছুঁই (৯৭৫)। দৈনিক করা অতি অপ্রতুল টেস্টের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে পাওয়া যাচ্ছে ২০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত মানুষ – যা দক্ষিন এশিয়ায় এখন সর্বোচ্চ। এটি চলতি মাসের শুরুতে অফিস আদালত খুলে দেবার আগের চিত্র, ওপেনিং এর প্রভাব বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো এক-দুই সপ্তাহ।

আমাদের করা মডেলিং-এ দেখা যায় যে জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহের পর (২২ জুন) বাংলাদেশে মোট সঙ্ক্রমণের সংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এর জন্য কতটুকু প্রস্তুত। সাধারনত কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের মধ্যে ২০ শতাংশের হসপিটালাইজেশন এবং ৫ শতাংশের আইসিইউ/ভেন্টিলেটর/বিশেষায়িত সেবার প্রয়োজন হয়। এর অর্থ আগামী ২২ জুন নাগাদ কেবল করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় ১৬ হাজার হাসপাতাল বেড এবং ৪ হাজার আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেটর এর প্রয়োজন হবার আশঙ্কা রয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা আমরা সংক্রমণের সর্বোচ্চ সীমা অর্থাৎ ‘পিকের’ কাছাকাছি এখনো পৌছাই নি, যার অর্থ এই সঙ্খ্যাগুলি পরবর্তীতে আরো বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং অনুযায়ী, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে করোনা আক্রান্তদের জন্য আইসোলেশন সজ্জা ছিল ১৩২৮৪ টি আইসিইউ ছিল ৩৯৯টি। অর্থাৎ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হসপিটালের শয্যা সংখ্যা এবং আইসিইউ-এর সংখ্যা বাড়াতে না পারলে করোনা আক্রান্ত সকলের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

গত কয়েকদিন ধরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন – এই তিন ভাগে ভাগ করে জোনভিত্তিক লকডাউন করার পরিকল্পনা আমরা গণমাধ্যমে শুনতে পারছি।  সংক্রমণের গতি যখন বেড়ে চলেছে তখন এ ধরণের পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে একদিনের কালক্ষেপণ হতে পারে অসঙ্খ্য সংক্রমণের কারণ এবং প্রতি একদিনের বিলম্ব স্বাভাবিকতায় ফিরবার অপেক্ষাকে কমপক্ষে ২.৪ দিন দীর্ঘতর করতে পারে । তাই সঠিক সময়ে সঠিক ও দ্রুততর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই ।

সরকারের একার পক্ষে করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।  আমাদের আজকের সামাজিক আচরণের উপর নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে। আজকে যদি রাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যথাযথভাবে করোনা সংক্রমণে প্রণীত সরকারের গাইডলাইন মেনে চলে, তাহলে এই মডেলিং এবং আশংকা ভুল প্রমাণিত হবে। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এই মডেলিং-এ উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেড়ে যাবে ।

লকডাউন এ রাষ্ট্রের কোষাগার খালি হয়ে যায়, জীবিকা বিপর্যস্ত হয় – কিন্তু জীবনের বিনাশ যেখানে অতিসম্ভাব্য, সেখানে টিকে থাকাটাই তো প্রধান লক্ষ্য ।   আমরা যত দ্রুততা এবং দক্ষতার সাথে সংক্রমণের গতি রোধ করতে পারব, তত তাড়াতাড়ি আবার আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরবার আশা করতে পারব । সবচেয়ে বড় কথা আমাদের আছে প্রচন্ড পরিশ্রমী অসঙ্খ্য মানুষ –  বছরের পর বছর ধরে তারাই টিকিয়ে রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা । করোনার এই কঠিন যুদ্ধে টিকে থাকতে পারলে  তারাই দিন-রাত এক করে আমাদের দেশটাকেও ফের দাঁড় করিয়ে দিতে পারবে ।

মডেলিং এবং বিশ্লেষণে,
Centre for Research, Innovation and Development Action (CRIDA)

লেখক: সিনিয়র পলিসি এনালিস্ট, গভর্নমেন্ট অফ আলবার্টা, কানাডা
মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান, প্রকৌশলী, ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা, কানাডা
ডাঃ শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সিনিয়র পলিসি লিড, আলবার্টা মিনিস্ট্রি অফ হেলথ, কানাডা

Comments

Bangladesh

Confirmed
678,937
Deaths
9,661
Recovered
572,378
Active
96,898
Last updated: এপ্রিল ১১, ২০২১ - ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ (+০০:০০)