করোনা: জরুরি পরীক্ষণমূলক নতুন ওষুধ প্লাজমা থেরাপি

52

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান:

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহর থেকে উৎপত্তি হয়ে আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী তছনছ করে চলেছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক অদৃশ্য অনুজীব- যার নাম করোনা ভাইরাস। ইতোমধ্যে ২১৩টি দেশে ছড়িয়ে গেছে। এসব দেশে সব রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হচ্ছে করোনা ভাইরাসের গতিবিধির ওপর নির্ভর করে। এ ভাইরাস গত ৩০ মে কেড়ে নিয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৮৯৬ মানুষের তাজা প্রাণ আর আক্রান্ত করেছে ৬০ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬৬ জনকে। ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে সংক্রমণ আর মৃত্যুর মিছিল, ধ্বংস করে চলেছে সভ্যতা, অর্থনীতি, জনজীবন। কঠিনভাবে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে বিজ্ঞানকে, বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে।

আজও আবিষ্কৃত হয়নি কোনো ওষুধ, ভ্যাকসিন। কোনোক্রমেই প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না ভাইরাসটিকে। ঠেকানো যাচ্ছে না মৃত্যু। মুমূর্ষু রোগীর জন্য পরীক্ষণ (ট্রায়াল) চলছে রেমডেসিভির ওষধের আর প্লাজমা থেরাপি ব্যবহারের। ক্লোরোকুইন ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেক দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধই কার্যকর হয়, অন্য কিছু নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ভ্যাকসিন তৈরির প্রার্থী ১১৪টি। এর মধ্যে ১০টি এগিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪টি, চীনের ৫টি, যুক্তরাজ্যের ১টিÑ যারা পরীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে। পাশের দেশ ভারতও পিছিয়ে নেই। চলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পরস্পরবিরোধী সংবাদের প্রতিযোগিতা। রয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা।

এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় কোনো নিরাপদ বা কার্যকর ওষুধ পাওয়া যায়নি। গবেষকরা আশা করছেন, কনভালেসেন্ট প্লাজমা মুমূর্ষু কোভিড রোগীর শরীরে সঞ্চালন করলে তার ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। এভাবে রোগীদের উপকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ঋউঅ) কোভিড-১৯ জরুরি জনস্বাস্থ্য চলাকালীন সেবা প্রদানকারী এবং গবেষকদের জন্য কোভিড-১৯ কনভালেসেন্ট প্লাজমা ব্যবহার ও পরীক্ষা করার জন্য একটি নির্দেশনা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত এফডিএ কোভিড-১৯ কনভালেসেন্ট প্লাজমা ব্যবহারের কোনো অনুমতি দেয়নি। এফডিএ কনভালেসেন্ট প্লাজমা সংগ্রহ এবং ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করে না।

এফডিএ বলেছে, although promising, convalescent plasma has not been shown to be safe and effective as a treatment for COVID-19.  therefore it is important to study the safety and efficacy of COVID-19 convalescent plasma in clinical trails. এ কারণে বর্তমানে এটিকে বলা হয় জরুরি পরীক্ষণমূলক নতুন ওষুধ (eIND)। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান আইএনডিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তাদের একটি নির্দিষ্ট ফরমে এফডিএর অনুমতি নিতে হয়।

রোগীর উপযুক্ততা : ১. ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত কোভিড-১৯ আক্রান্ত। ২. মারাত্মক অথবা জীবন হুমকির সম্মুখীন মারাত্মক বলতে বোঝায় শ্বাসকষ্ট, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার প্রতিমিনিটে ৩০ বারের বেশি, রক্তে অক্সিজেনের সম্পৃক্ততা শতকরা ৯৩ ভাগের কম, ফুসফুসের অকার্যকারিতা ২৪-৪৮ ঘণ্টায় ৫০ ভাগের বেশি।

জীবন হুমকির সম্মুখীন বলতে বোঝায় শ্বাস-প্রশ্বাস অকার্যকর, সেপটিক শক, শরীরের একাধিক জরুরি অঙ্গ অকার্যকর।

প্লাজমা প্রদানের উপযুক্ততা : ১. রক্তদানের সব সাধারণ যোগ্যতা থাকতে হবে। ২. রক্তবাহিত সংক্রামক রোগের পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে। ৩. ল্যাবরেটরিতে কোভিড-১৯ শনাক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত থাকতে হবে। ৪. রক্তদানের অন্ততপক্ষে ১৪ দিন আগে সম্পূর্ণভাবে উপসর্গমুক্ত হতে হবে। ৫. একান্ত জরুরি ক্ষেত্র ছাড়া রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ (ঞরঃৎব) দেখে নিতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রেও পরে দেখে নিতে হবে।

প্লাজমা (রক্তরস) : এটি হালকা হলুদাভ তরল- যা সাধারণত দেহের বিভিন্ন প্রকার রক্তকোষ ধারণ করে। মানবদেহের রক্তের প্রায় শতকরা ৫৫ ভাগ হচ্ছে প্লাজমা। এর ৯৫ শতাংশ হচ্ছে পানি এবং ৬-৮ শতাংশ বিভিন্ন প্রোটিন, গ্লুকোজ, রক্ত জমাটবাঁধার উপাদান, ইলেকট্রোলাইটস, হরমোন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেন।

কনভালেসেন্ট প্লাজমা : মানবদেহে যখন কোনো জীবাণু প্রবেশ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং প্রস্তুত হয় অ্যান্টিবডি। এই অ্যান্টিবডি শরীরে রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ, ধ্বংস ও প্রত্যাহার করে। কোনো আক্রান্ত রোগী সুস্থ হলে তার শরীরের প্লাজমাকে কনভালেসেন্ট প্লাজমা বলা হয়। এর মধ্যে ওই জীবাণুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি থাকে। এ প্লাজমা যদি একই জীবাণুতে আক্রান্ত অন্য রোগীর দেহে সঞ্চালিত করা হয়, তা হলে একইভাবে ওই রোগীর শরীরেও এ অ্যান্টিবডি রোগ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এর আগেও ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে, পরবর্তীকালে সার্স, ইবোলা, এইচওয়ান, এনওয়ানসহ বিভিন্ন রোগে প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করা হয়েছে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতেই চীনের চিকিৎসকরা মুমূর্ষু কোভিড রোগীদের প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে। ওই সময়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে কার্যকর ও জীবন রক্ষাকারী বলে মন্তব্য করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সরকার মুমূর্ষু কোভিড রোগীর জন্য প্লাজমা থেরাপি ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে। গত ৮ মে ভারতের মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (আইসিএমআর) ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই প্লাজমা থেরাপির ট্রায়াল চলছে।

বাংলাদেশ সরকার প্লাজমা থেরাপি ট্রায়ালের জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগও করেছে। এ ছাড়া বিছিন্নভাবে বিভিন্ন হাসপাতাল প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করছে। মনে রাখতে হবে, প্লাজমা থেরাপি মুমূর্ষু কোভিড রোগীদের জন্য একটি পরীক্ষণমূলক (ট্রায়াল) ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয়ভাবে এর একটি নিয়ন্ত্রণ থাকতেই হবে। প্রধানত, এটি রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের দায়িত্ব। বাংলাদেশে গর্ব করার মতো দেশব্যাপী রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, কর্মপরিকল্পনা ও নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ বিভাগের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্লাজমা থেরাপির ট্রায়ালের কাজটি হতে হবে।

সুপারিশগুলো : ১. দ্রুত টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সমন্বয় স্থাপন করতে হবে। ২. গণমাধ্যমের মাধ্যমে উপযুক্ত ডোনারের মোটিভেশনের জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. প্লাজমা প্রয়োগের আগে অ্যান্টিবডির পরিমাণ (টাইটার) দেখতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রে না পারলে পরে দেখে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব রোগীর ক্ষেত্রে যথাযথ অ্যান্টিবডি প্রস্তুত নাও হতে পারে। ৪. মোটিভেশন ও প্লাজমা সংগ্রহের জন্য সন্ধানীর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। ৫. টেকনিক্যাল কমিটিকে জানিয়েই সব হাসপাতালে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশেও সংক্রমণের হার বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন মৃত্যু তালিকা। সরকারকে জীবন ও জীবিকা- দুটি বিষয় নিয়েই ভাবতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয়। আজ ১ জুন থেকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই খুলে যাচ্ছে অফিস-আদালত, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এ ভয়ঙ্কর মহামারী সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করি।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ।

Bangladesh

Confirmed
159,679
+3,288
Deaths
1,997
+29
Recovered
70,721
Active
86,961
Last updated: জুলাই ৪, ২০২০ - ৩:৪৮ অপরাহ্ণ (+০০:০০)