করোনার চিকিৎসায় মানুষের আস্থা কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার

18

কোভিড-১৯ এর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাফেরা অনেকটা স্থবির। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মালিহার বাবা-মা’সহ পরিবারের ৫ সদস্য সকলেই কোভিড পজেটিভ। তবে, মালিহার বাবা-মায়ের অবস্থা খুব বেশি ভালো না থাকায় তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তাটা একটু বেশি। এমন কঠিন সময়ে কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার থেকে ডাক্তারের ফোন আসে মালিহার কাছে। ঘরবন্দী পরিস্থিতিতে ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পেরে তার পরিবারের সকলেই কিছুটা আশ্বস্তবোধ করেন। এরপর এ সেন্টারের ডাক্তারদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ ও ফলোআপ চিকিৎসা নিয়ে সকলেই এখন বেশ সুস্থ। ঘরে বসে এধরনের সেবা পেয়ে এই টেলিহেলথ সেন্টারের উপর মালিহার আস্থা তৈরি হয়। করোনা পরিস্থিতিতেও সঠিক তথ্য ও ডাক্তারি পরামর্শ তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে সহায়তা করেছে।

অন্যদিকে কয়েকদিন ধরেই বিদ্যানন্দ দে এর শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। কাশি, গলাব্যাথার সাথে জ্বরও আছে। পরে কোভিড-১৯ এর পরীক্ষায় ফলাফল পজেটিভ আসে। চিকিৎসা সেবা নিতে ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে গেলে বাদ সাধে সংকটকালীন পরিস্থিতি। কোন ডাক্তারই তাঁর চিকিৎসা করতে এগিয়ে আসলেন না এমনকি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকও সেবা দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেন। অনেকটা নিরুপায় হয়েই ফোন করলেন কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টারের হটলাইন নম্বরে। এ সেন্টারে কর্তব্যরত ডাক্তার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তাঁর সমস্যাগুলোর কথা শুনলেন। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ দিলেন। কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার থেকে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে এবং প্রতিনিয়ত ফলোআপ চিকিৎসায় কোভিড থেকে সেরে উঠেছেন তিনি।

প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে প্রাপ্ত ডাটার ভিত্তিতে ফোন করে দেশে করোনায় আক্রান্তদের স্বাস্থ্য পরামর্শ ও নিয়মিত ফলোআপ সেবা দিয়ে যাচ্ছে কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার। শুধু তাই নয় ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে দেশের যেকোন নাগরিক কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য তথ্য সেবা ও ডাক্তারি পরামর্শ নিতে পারছেন এ সেন্টার থেকে।

এই টেলিহেলথ সেন্টার থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার হাজার রোগীকে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। কোভিড আক্রান্ত রোগীকে সেবা প্রদান করতে সক্ষম এই সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত ১১ লাখের অধিক রোগীকে সেবা প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমানে করোনা ডট গভ ডট বিডি (www.corona.gov.bd) পোর্টালে নিবন্ধনের মাধ্যমেও সাক্ষাতের (অ্যাপয়েন্টম্যান্ট) ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছ থেকে টেলিমেডিসিন সেবা ও পরার্মশ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও এ সেন্টার থেকে জরুরি সহযোগীতামূলক চিকিৎসা সেবা যেমন- অ্যাম্বুলেন্স, নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের খোঁজ, জরুরি ওষুধ সরবরাহ, হাসপাতালে ভর্তিতে সহযোগীতা দেওয়া হয়।

সেবা প্রদানের বিষয়ে বলতে গিয়ে এটুআই-এর চিফ ই-গভর্নেন্স স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার ও মা টেলিহেলথ সেন্টারের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফরহাদ জাহিদ শেখ বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস থেকে প্রতিদিন কোভিড শনাক্ত হওয়া রোগীদের তথ্য এ সেন্টারে আসার পর সিআরএম সিস্টেমে জমা হয়। সেই তথ্য অনুযায়ী সেন্টারে অবস্থানরত হেলথ ইনফরমেশন অফিসার রোগীদের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য ডাক্তারের সাথে যুক্ত করে দেন। এরপর তার নিয়মিত ফলোআপ চলতে থাকে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (পরিচালক, এমআইএস) অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে অনুমোদিত ল্যাবের মাধ্যমে প্রতিদিন কোভিডের নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং কোভিড পজিটিভ রোগীর তথ্য এমআইএস’র ডাটাবেইজ-এ সংক্ষরিত হয়। এমআইএস কর্তৃক ইন্ট্রিগ্রেশনের মাধ্যমে প্রতিদিন কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টারে প্রেরণ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাস্তবায়নাধীন এটু্আই প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টার থেকে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে টেলিহলেথ স্বাস্থ্য সেবা এবং পরামর্শ প্রদান করা হয়। গত প্রায় এক বছর ধরে এই সেবা প্রদান করা হচ্ছে। কোভিড অতিমারীর সংকটকালীন সময়ে এই সেবাটি অত্যন্ত কার্যকর এবং ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখছে।”

গত বছরের মার্চে বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শে এটুআই কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে টেলিমেডিসিন সেবার একটি নকশা প্রণয়ন করে। নারায়নগঞ্জ জেলার সদর উপজেলাতে মাঠপর্যায়ে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সেবা প্রদানকারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলামের নেওয়া পদক্ষেপ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে এ সার্ভিস মডেলটি তৈরি করা হয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে এটুআই, স্বাস্থ্য বাতায়ন (সিনেসিস আইটি) এর কারিগরি সহায়তায় ২০২০ সালের ১৩ জুন কোভিড ১৯ টেলিহেলথ সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়।

এটুআই ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ কোভিড-১৯ টেলিহেলথ সেন্টারটি প্রতিনিয়ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের কাছে একটি ফোন কলেই বিনামূল্যে, প্রয়োজনী স্বাস্থ্য পরামর্শ ও তথ্য সেবা প্রদান করে আসছে। যার ফলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ঘরে বসেই বিনামূল্যে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরামর্শ পাচ্ছেন।

Comments

Bangladesh

Confirmed
837,247
+3,956
Deaths
13,282
+60
Recovered
773,752
Active
50,213
Last updated: জুন ১৭, ২০২১ - ১:১৭ পূর্বাহ্ণ (+০০:০০)