অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ৬৫ বছরোর্ধ মানুষকে না দেয়ার কারণ নেই

19

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম:

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন যুক্তরাজ্যে অনুমোদনের পর এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। কয়েক দিনের ভেতরেই হয়তো অনুমোদন পেয়ে যাবে। এর ভেতরেই জার্মানি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটি ৬৫ বছরের বেশী বয়সের মানুষকে না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আর এই খবর চারদিকে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ৬৫ বছরোর্ধ বয়েসের মানুষকে দেয়া যাবে না।

কিন্তু ষাটোর্ধ মানুষেরাই সবচেয়ে বেশী উপকৃত হবে করোনা ভ্যাকসিনে। কারণ আক্রান্ত হলে এরাই বেশী মারা যাচ্ছে।

একটা ভ্যাকসিন কখন দেয়া যাবে না? ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যদি দেখা যায় যে ভ্যাকসিন দেয়াতে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে অথবা ভ্যাকসিনটি কোন ভাবেই রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী না, শুধু তখনই কেবল ভ্যাকসিনটি না প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। এমন ঘটনা কি অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ঘটেছে?

অ্যাস্ট্রাজেনেকা আলাদাভাবে বৃহৎ পরিসরে ৪০০ জন ৫৬-৮০ বছর বয়সের মানুষের উপর তাদের ভ্যাকসিনটির ফেইজ-২ ট্রায়াল চালিয়েছে যুক্তরাজ্যে। ট্রায়ালের ফলাফলে তারা দেখিয়েছে যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের দুটি পূর্ণ ডোজ বৃদ্ধ মানুষের (৫৬-৮০ বছর) শরীরেও একই রকম ইমিউন রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম, যেরকমটি দেখা গেছে ১৮-৫৫ বছরের মানুষের শরীরে। ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধদের শরীরেও পর্যাপ্ত পরিমান নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি এবং টি-সেল রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম। উপরোন্ত ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধদের শরীরে কোন প্রকার খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি, বরং তাদের ভেতর সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন ছিল অনেক হাল্কা (ল্যানসেট, ১৯ নভেম্বর ২০২০)।

যুক্তরাজ্য এবং ব্রাজিলে চালানো ফেইজ-৩ ট্রায়ালে তারা দেখিয়েছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি গড়ে ৬২-৭০ শতাংশ কার্যকরী, যেখানে ৫৬ থেকে ৭০ বছরের বেশী বয়সের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ছিল গড়ে ১০ শতাংশের উপরে (ল্যানসেট, ৮ ডিসেম্বর ২০২০)। জার্মানি অবশ্য দাবী করছে যে এই বয়সের অন্তর্ভুক্তি ছিল ৪-৮ শতাংশ। অ্যাস্ট্রাজেনেকা অবশ্য বলছে ১০ শতাংশ অন্তর্ভুক্তির কথা। জার্মানির যুক্তি হচ্ছে যেহেতু ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালে ৫৬-৭০ বছর বয়সের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪-৮ শতাংশ। তাই এই গ্রুপের মানুষের উপর কার্যকরীতার ফলাফল অতোটা নির্ভরযোগ্য নয়।

এটা ঠিক যে ফেইজ-৩ ট্রায়ালে ৫৬ থেকে ৭০ বছরের উপরের বয়সের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ২০-২৫ শতাংশ হলে সবচেয়ে ভাল হতে। তবে, অন্যদিকে এটাও ঠিক যে ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধদের উপর বিশেষ ভাবে চালানো ফেইজ-২ ট্রায়ালে শক্তিশালী ইমিউনোজেনিক রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। এতে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধদের উপরও কাজ করবে।

বাংলাদেশে সেরামের বানানো অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন বা কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের প্রয়োগ পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে। এ সময় মিডিয়াতে এ ধরণের নেতিবাচক খবর দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচীকে ব্যাহত করবে।

সম্প্রতি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাকবিতন্ডা চলছে। কারণ অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ইউরোপে তাদের ভ্যাকসিনের সরবরাহ মার্চ পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ তাদের ইউরোপে ভ্যাকসিন সরবরাহকারী বেলজিয়াম কোম্পানিটির উৎপাদন কমে গেছে। আর এই খবরেই জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলো ভিষণ চটেছে! মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিন বন্দোবস্তে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফাইজারও বলে দিয়েছে যে তারাও ইউরোপে ভ্যাকসিন সরবরাহ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ভ্যাকসিনের বন্দোবস্তে ব্যার্থ হয়ে সেই রাগ এখন তারা ঝারছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার উপর!

আমাদের, বাংলাদেশীদের ইউরোপের খামখেয়ালিতে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে ৭০ বছরোর্ধ বৃদ্ধদের। আমাদের দিতেও কোন সমস্যা নেই। তবে যাদের বয়স ৮০ বা ৯০ এবং যাদের শারীরিক অবস্থা খুবই নাজুক তাদের ক্ষেত্রে যেকোন ধরনের ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

লেখক: এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি, সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

Comments

Bangladesh

Confirmed
1,249,484
+9,369
Deaths
20,685
+218
Recovered
1,078,212
Active
150,587
Last updated: জুলাই ৩১, ২০২১ - ১০:৪৮ অপরাহ্ণ (+০০:০০)