ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সাবধানতা: অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ

1584

নিজস্ব প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সাবধানতা।

সম্প্রতি তিনি এটিএন বাংলায় ‘গ্রীন লাইফ হার্ট সেন্টার হেলথ জংশন’স্বাস্থ্য বিয়য়ক অনুষ্ঠানে এ সব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি  সঞ্চালনা করেন ডা. শাহেদ ইমরান।

অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু হচ্ছে- মশা বাহিত রোগ। এটি মূলত বর্ষাকালে হয়। এডিস মশার ক্যারেক্টার হলো যেখানেই পানি জমে সেখানেই গিয়ে ডিম পাড়ে। এসির যে পানি জমে তার মধ্যেও ডিম পাড়ে।

জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি থেকেই আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু মে জুনের পর এসে তা কিন্তু ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।তবে যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে আরো অন্তত ৫ থেকে ১০ গুন বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে বলে এই বিশেষ চিকিৎসকের ধারণা।

তিনি বলেন, অনেকে এটাকে মহামারি বলছে, আসলে মহামারি না। প্রকোপটা বেড়ে গেছে বলা যায়। ঢাকা শহরে ২ কোটি মানুষ । তার মধ্যে কয়েক হাজার আক্রান্ত হয়েছে। এটা কিন্তু এতোটা সিরিয়াস না। আমরা ভয় পাচ্ছি আতঙ্কিত হচ্ছি।

ডেঙ্গু লক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্য ভাইরাস জ্বরের মতই এর লক্ষণ। জ্বর হবে।  হাই টেমপারেচার, শরীরের ব্যাথা, জয়েন্টে ব্যাথা। মাথা ব্যাথা চোখে ব্যাথা। প্রচন্ড ব্যাথা হয়। সাধারনত ট্রিপিক্যাল কেসে চার থেকে পাঁচ দিন জ্বর থাকে। তারপর জ্বর কমে যায়। তখন গায়ে র‌্যাশ ওঠে লাল লাল এলার্জির মত। জ্বর কমে গেলে ওই সময়ে রোগী ব্লাডের প্লাটিলেট কমতে থাকে। কমলেই তখন কিন্তু রক্ত ক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে রক্ত ক্ষরণ হতে পারে। নাকে, ব্রাশ করতে রক্ত। চোখে রক্ত, চামড়ার নিচে রক্ত। পায়খানার সঙ্গে রক্ত এরকম কিন্তু হতে পারে। এটাকে আমরা বলি ডেঙ্গু হেমরেজিক ফিবার। এটাকে একটা ডেঞ্জারজ রোগ বলতে পারেন।

এখানে কিছু কিছু কেসে রোগী হঠাৎ করে অজ্ঞাণ হয়ে যায়। ব্লাড পেশার পাওয়া যায় না। পালস বোঝা  যায় না। এটাকে বলে ডেঙ্গু শক্ সিনড্রোম। এটা খুবই ডেঞ্জারাস। এটা কমন না। সবার হয় না। এটা খুবই রেয়ার। তবে হয়ে গেলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। এর মধ্যে কয়েকজন যারা মারা গেছেন, তারা কিন্তু ডেঙ্গু শক্ সিনড্রোমে মারা গেছেন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেকে মারা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মারা যাওয়ার মুল কারণ হলো- এটা তো ভাই রাস জ্বর। অনেকে মনে করেন ভাইরাস জ্বর। ঘরে বসে থাকেন। এই চার-পাঁচ দিনে এমনিই কমে যাবে। এই ভুলটা করে। অবহেলা করে বসে থাকে। সময় মত নির্নয় ও চিকিৎসা হয় না। ফলে  ডেঙ্গু শক্ সিনড্রোমে গিয়ে মারা যায়।

যেকোনো জ্বরই হোক ঘরে বসে থাকবেন না। একটু জ্বর হলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তাহলে তারাতাড়ি সনাক্ত হলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু হবে। এতে কিন্তু ঝুকিটা কমে যায়।

 ডেঙ্গুর ধরনাটা কিন্তু পাল্টে গেছে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, নরমালি যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে আমরা কিন্তু পাচিছ না। আমি যেটা বললাম, ৪/৫ দিন জ্বর। গায়ে র‌্যাস হয়, প্লাটিলেট কমবে, এরপর রক্তক্ষরণ হবে। এটা তো ট্রিপিক্যাল কেস। জ্বরের দুই একদিন পরে রোগী রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়। জ্বরে তেমন হাই টেমপারেচার নেই। জয়েন্ট পেইন, মাসেল পেইন, সমস্ত শরীর ব্যাথা মাথা ব্যাথা চোখে ব্যাথাকিছু কিছু রোগীর এগুলোও পাওয়া য়ায় না। সিম্পল জ্বর। দুই তিন দিনের মধ্যে প্লাটিলেট কমে যায় এবং তার রক্ত ক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। অনেক ডাক্তারও যদি খেয়াল না রখেন তাহলে তিনিও কিন্তু মিস করতে পারেন। যেহেতু এখন ডেঙ্গর প্রকোপ বেশি। তাই জ্বর হলেই ডাক্তার দেখিয়ে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ । মাত্র দুটি পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়্। সিভিসি করে প্লাটিলেট দেখলেই বোঝা কমেছে কিনা।

রোগীরা নিজেরা মেডিসিন খেলে প্যারা সিটামলে বাইরে কোনো অষুধ খাওয়া যাবে না। প্রচুর পরিমান শরবত সালাইন খেতে হবে। যাদের বমি হবে। খেতে পারবে না। তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে আমরা তাদের শিরায় স্যালাইন দেবো। এবং যাদের রক্ত ক্ষণ হয় তাদের কিন্তু ব্লাড দেওয়া লাগতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ সমস্বিত ভাবে মশা নির্মুল করতে হবে উল্লেখ করেন তিনি।

গত ২১ জুন একদিনে দেশে ডেঙ্গু  আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৬ জন।  একমাসের ব্যবধানে ২২ জুলাই একদিনে সরকারি হিসেবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০৩ জন।  

এর আগে ২১ জুলাই আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩১৬ জন। রোববার রাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান একজন সিভিল সার্জন। তার আগে এক নারী চিকিৎসকও ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্ ইমার্জেন্সী অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ৭১৭৯ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৫ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬৬৫ জন। ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৫০৯ জন।