উপজেলা এরশাদেরই সৃষ্টি

21

ডেস্ক রিপোর্ট: ইতি ঘটল এক দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের। চলে গেলেন বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের (১৯৮২-১৯৯০) শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

দেশের স্থানীয় সরকারে জেলার পরের স্তরে যে ‘উপজেলা’ রয়েছে, তা এরশাদেরই সৃষ্টি। এই উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্যই এরশাদ গণমানসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা মূলত আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশি কেন্দ্র হিসেবে থানাগুলোকে সৃষ্টি করে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের জন্য ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো থানা পর্যায়ে একটি স্থানীয় সরকার ইউনিট গঠন করা হয়। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে একটি আইনি কাঠামো দাঁড় করাতে ১৯৮২ সালে স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ধাপে ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।

উপজেলা পরিষদসমূহের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যানবৃন্দ ১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও সংস্কারেও এরশাদ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার মাধ্যমে দেশে জেলার সংখ্যা ৬৪ করা হয়। এগুলোর অধীনে আবার ন্যস্ত করা হয় ৪৬০টি উপজেলাকে।

উপজেলা ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’ তরফেই ছিল প্রবল বিরোধিতা। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার তারপরও উপজেলা পরিষদ গঠন করে উপজেলা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

অবশ্য উপজেলাকে মেনে নেওয়া হলেও এখনো এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, উপজেলায় তেমন কোনো কাজকর্ম নেই, দায়দায়িত্ব নেই, এতে পরিপূর্ণ স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই, স্বশাসন নেই।

বলা হচ্ছে, এর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই। নিজস্ব রাজস্ব আয়ের উৎস সৃষ্টির সুযোগও তেমন একটা নেই। এর নিজস্ব রাজস্ব আয় সৃষ্টির কিছু সুযোগ তৈরি করতে গেলে তৃণমূলের ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের রাজস্ব আয়ের বেশ কিছু উৎস কর্তন করতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউনিয়ন, পৌরসভার সঙ্গে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়বে।

বলা হচ্ছে, উপজেলায় জনগণকে সেবামূলক সার্ভিস দেওয়ার মত তেমন কোনো সুযোগ নেই। এর মাধ্যমে যেসব সেবামূলক সার্ভিস দেওয়ার কথা বলা হয় তা দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ সেসব সার্ভিস অনায়াসে ইউনিয়ন, পৌরসভার মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব।

বলা হচ্ছে, উপজেলার প্রতিনিধিগণের জন্য গাড়ি, ড্রাইভার, বাসা, বিশাল দাপ্তরিক ভবন, পিয়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লোভনীয় পদবী, বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বিদেশ ভ্রমণ, অপক্ষমতা ও নানাবিধ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুযোগসুবিধা এসব লোভনীয় সুযোগসুবিধা থাকায় পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য প্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের প্রচন্ড মোহ তৈরি হয়। পাশাপাশি, উপজেলা নির্বাচনে যারা চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়, তাদের লক্ষ্য কিন্তু উপজেলায় দায়িত্ব পালন করা নয়, উপজেলা কেন্দ্রীক উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কর্মকান্ড নিয়ে চিন্তাভাবনা করাও নয়। তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি সুযোগসুবিধা ও পদবী কাজে লাগিয়ে কেবল নিজস্ব ভাগ্য উন্নয়নে প্রচেষ্টা চালানো।

সে যাই হোক, এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টি নিয়ে এখনো গর্ব করেন। যদিও সমলোচকরা এখনো উপজেলাকে ‘উপজ্বালা’ বলেও অভিহিত করে থাকেন।