টাকা ছাড়া মর্গ থেকে বের হয় না লাশ!

18

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : সরকারি  নির্দেশনা অনুযায়ী মর্গে বিনা টাকায় ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। প্রতিবেদনও দিতে হবে টাকা ছাড়া। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।

নিয়মানুযায়ী মর্গ থেকে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একটি কপি তুলে দিতে হয়। সে অনুযায়ী মর্গেই লেখার কথা প্রতিবেদনটি। এখন সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় বাড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মর্গে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, টাকা ছাড়া মর্গ থেকে লাশ বের হয় না। ময়নাতদন্তে নানা খাত দেখিয়ে নিহতের স্বজনদের কাছ থেকে দুই হাজার থেকে শুরু করে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এজন্য কোনো রশিদ বা বৈধ কাগজও দেওয়া হয় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিধিটা পিআরবি আর সরকারি নির্দেশনাতেই আটকে আছে। কোনো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই নির্ধারিত সময়ে দেওয়া হয় না। ঘণ্টা পার হয়ে দিন, মাস আর বছর চলে গেলেও বেশিরভাগ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায় না। মাসের পর মাস মর্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে থাকার আড়ালেও বিভিন্ন মর্গ অফিসে টাকা লেনেদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

ময়নাতদন্ত বিভাগের বিভিন্ন কর্মী সংশ্নিষ্ট মামলায় পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এই টাকা নেন। নিহতের পরিবার এই টাকার উৎস হলেও অজ্ঞাতপরিচয়ে লাশের স্বজন না থাকায় আটকে থাকে সেসব ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন।

কোনো কোনো ঘটনায় মামলার চার্জশিট জমা নিয়ে সময়ের বাধ্যবাধকতা থাকায় পুলিশের সংশ্নিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার পকেটের টাকা খরচ করেই নিতে হয় এই প্রতিবেদন।

বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত পাওয়া যায়। কিন্তু আত্মহত্যা বা অজ্ঞাতপরিচয়ে উদ্ধার লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন মাস থেকে বছর পার হলেও তা আর তৈরি হয় না।

সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরির বিলম্বের কারণে বদলে ফেলা হতে পারে মৃত্যুর আসল কারণ। ময়নাতদন্ত থেকে প্রতিবেদন দেওয়ার দীর্ঘ সময়ের ফাঁকে প্রভাবিত হতে পারেন চিকিৎসক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও। বিভিন্ন সময়েই ভুক্তভোগীরা টাকার বিনিময়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বদলে দেওয়ার অভিযোগ তুলে আসছেন।

পুলিশের এক ঊধ্ববতন কর্মকর্তা বলেন, পিআরবি বিধি অনুযায়ী ময়নাতদন্ত শেষে লাশের সঙ্গে পুলিশ সদস্য বা কনস্টেবলের কাছে হস্তান্তর করা কার্বন কপি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু বিস্তারিত রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে তাতে বিলম্ব করা হয়। এই বিলম্বের মধ্যেই ঘটতে পারে অঘটন। বিধি অনুযায়ী ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন একটিই। বিস্তারিত রিপোর্ট বলে আইনে বা বিধিতে কিছু নেই।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত সিআরপিসি ও পিআরবির ধারাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করলে পরবর্তী সময়ে কোনো চাপ, ভয়ভীতি বা লোভের কাছে নতিস্বীকারের সুযোগ থাকে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও নিশ্চিত হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সূত্রে জানা গেছে, তারা গবেষণা করে ময়নাতদন্তের ভুলের নানা কারণ দেখিয়েছেন। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের জন্য যথাযথ আর্থিক বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিলেন। এই অর্থ বার্ষিক পুলিশ বাজেটে যুক্ত করার কথাও বলেছিলেন।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক হাসপাতাল থেকে মর্গ পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে লাশ আটকে টাকা নেওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। হরিপুর ভাতুরিয়া এলাকার গৃহবধূ হাজেরা বেগম (২০) আত্নহত্যা করেন। হাজেরার লাশ নিতে স্বজনরা তার মায়ের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দেন। হাজেরার মা সালেহা বেগম সেই টাকা দিয়ে মর্গ থেকে লাশ বুঝে নেন।

মুক্তা নামে হাজেরার এক স্বজন বলেন, লাশের গোসল, আর কাপড় কেনার কথা বলে মর্গের লোকজন এই টাকা নিয়েছে। আরো বেশি চেয়েছিল। দর কষাকষি করে তা কমানো হয়েছে। তবে এটা টাকা নিয়ে কোনো রশিদ দেয়া হয়নি। অথচ লাশের ময়নাতদন্ত করেতে এক টাকাও খরচ হওয়ার কথা না।

মর্গে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, লাশকাটা ঘরের চিত্রই অভিন্ন। মর্গে চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে যারা কাজ করেন তারাই লাশের স্বজনের আবেগকে জিম্মি করে বিভিন্ন খাতের নামে টাকা হাতিয়ে নেন। এজন্য মর্গে রীতিমতো সিন্ডিকেটও গড়ে উঠেছে।

বিভিন্ন থানার তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশের পুলিশ ছাড়া আর কোনো স্বজন থাকে না। এজন্য প্রতিবেদন পেতে কারও তদবিরও থাকে না। কাউকে ‘খুশি’ করাতেও কেউ যায় না। এতে ময়নাতদন্ত হওয়ার পর বছর পার হলেও প্রতিবেদনটা আর তৈরি হয় না। মামলার তদন্তও এগোয় না।

টাকা নিয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন উল্টে দেওয়া বা টাকা ছাড়া প্রতিবেদন না পাওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকারও করেন ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের আরএমও।

সিভিল সার্জন ডা. এইচএম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ তো লোভের ঊর্ধ্বে নয়। লোভে পড়ে প্রস্তাবটা কারা দেয়, তা খুঁজে বের করা উচিত।’ তার প্রতিষ্ঠানে ময়নাতদন্ত আটকে বা তথ্য ঘুরিয়ে দিয়ে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘হয়তো মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এই সুযোগটা একেবারেই কম। কিন্তু গ্রামের মর্গে নানা কারণে এমনটা হতে পারে। সেখানে প্রভাবিত হওয়ার যেমন পরিবেশ থাকে, তেমনি রক্তচক্ষুও উপেক্ষা করা যায় না। তা ছাড়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চিকিৎসক আর পুলিশের মধ্যকার কাজ হলেও বাদী বা বিবাদী পক্ষও এসে প্রভাব দেখায়, লোভে ফেলার চেষ্টা করে। অনেক সময়ে খোদ তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার প্রভাবও থাকে।’

পুলিশ কর্মকর্তার প্রভাব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. এইচএম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা দিয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ঘুরিয়ে দেওয়া বা টাকার জন্য ময়নাতদন্ত আটকে রাখার অভিযোগটা সব সময়ই শুনতে হয়। কারণ একটা হত্যাকাণ্ডে বাদী এবং আসামি দুটি পক্ষ থাকে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কিন্তু একজনের পক্ষে যায়। সে ক্ষেত্রে অপর পক্ষ নানা অভিযোগ করতেই পারে। এর পরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

৭২ ঘণ্টার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বছরের পর বছর ধরে মর্গে আটকে থাকার বিষয়ে দুই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অভিন্ন মত দিলেন। তারা জানান, মূলত জনবলের অভাবে এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কম থাকায় প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়। এ ছাড়া ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্যও আটকে থাকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর প্রতিবেদন আগে দেওয়া হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের মর্গের দুজন মর্গ সহকারী নাম প্রকাশ না করে নিহত ব্যক্তির স্বজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তারা দাবি করেছেন, একটি লাশ কেটে সেলাই করে প্যাকেট করে দেন তারা। এজন্য স্বজনরা ‘খুশি’ হয়ে যে টাকা দেন, তাই তারা নেন। কেউ না দিলে চেয়ে নেন না, জোরাজুরিও করেন না।

পুলিশ সূত্র জানায়, সাধারণত অপমৃত্যুর মামলাগুলোর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। এজন্য মামলার পুলিশি তদন্ত শেষ হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া যায় না। এর ফলে বিচার কাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলার নিষ্পত্তিতেও সময় লাগে।