তোমরা বেঁচে থাকবে আবহমানকাল ধরে বঙ্গবন্ধুর বাঙালীদের অন্তরে

46

আল- আমিন বাবু: সময়টা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর এর ১২ থেকে ১৪ এর ভিতরে।মেজর জলিল,ক্যাপ্টেন বেগ,মেজর জিয়াউদ্দিন ,ক্যাপ্টেন হুদা সহ শত শত মুক্তিযোদ্ধারা বরিশাল দখল করে নিলো।আমাদের সে কি আনন্দ !
আমার ভাইয়ারা যখন মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সদর গার্লস ইস্কুল ও বেলস পার্কের মাঠে যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছিলো, তখন বয়সের কারণে আমরা তাদের ট্রেনিংয়ে চান্স না পেলেও আমরাও বসে ছিলাম না।আমরা কাঠের বন্দুক বানিয়ে নিলাম।কেউ কেউ নারকেল গাছের ডগাকেই বন্দুক বানালাম।আমাদের পাড়ায় প্রায় প্রত্যেক
বাড়িতেই এক একটা ট্রেঞ্চ তৈরী হয়ে গেলো যা হয়ে উঠলো আমাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার ক্ষেত্র । এভাবে চললো আমাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বরিশাল এট্যাক হবার আগে প্রযন্ত। তারপর শুরু হলো আমাদের জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো এখন থেকে সেখানে,যা চললো নয় মাস।

তারপর একদিন স্বাধীন হোলাম,মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এলো বিজয় পতাকা উড়িয়ে,আমরা আমাদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটা স্বাধীন হবার আনন্দে আবারও খেলতে শুরু করলাম। তেমনই একদিন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা মুক্তিবাহিনীর গাড়ির বহর অতিক্রম করবার সময় তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার সেই কাঠের বন্দুকটিকে জোরে মাটিতে ঠুকে ফৌজি কায়দায় সেলুট করলাম। সাথে সাথে জোরে ব্রেক করে গাড়িটি থেমে গেলো।আমি কিছুটা হতভম্ব,ভয়ে দৌড় দিতে উদ্যত হয়েছি ।কিন্তু পিছন থেকে একটা ডাক শুনলাম “এ বাবু দাড়াও দাড়াও।” ভাইয়ার বন্ধু পরিমল ভাই যাকে আমি প্রথম দেখেছি কীর্তনখোলার স্টিমার ঘাটে ভাইয়ার দলের সাথেই ফিরেছিলেন সাঁজোয়া বাহিনীর সাজে । এবার গাড়ির সামনের দরজা দিয়ে নেমে এলো একজন লম্বা চওড়া পেশীবহুল কাঁটা কাঁটা চেহারার মানুষ ! পরিমল ভাই বললেন,”ও আমাদের তারেকের ছোট ভাই ।” এবার তিনি আমার কাছেই আসলেন বললেন,”এটেনশন ! আমি সাথেসাথে এটেনশন হয়ে গেলাম আমার কাঠের বন্দুকটি নিয়ে । তিনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন, আমার গালটি একটু টেনেও দিলেন,এবার আমার হাতে ১০টি টাকা দিলেন যা আমি কোনো ভাবেই নিলাম না “মা ” এর কাছে কি বলবো এই ভয়ে ? অতপরঃ মেজর সাহেব নিজেই পরিমল ভাইয়ের সাথে আমাদের বাড়িতে ঢুকলেন আম্মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। আজও মনে আছে আম্মা তার দেয়া ১০টি টাকা দিয়ে আমাকে একটা বাটার জুতো কিনে দিয়েছিলেন।জুতোটি যতবার পড়তাম ততবার নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধাই মনে হয়েছে।

এর পর ৯৬ সালে আমি সুইডেন থেকে বাংলাদেশে এসেছি,ধানমন্ডি ৮ নম্বরে ভোঁ মন্ড দোকানের সামনে দাঁড়ানো,সাথে আমার বাচ্চারাও রয়েছে,একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো, গাড়ি থেকে নামলেন সেই মানুষ যাকে চিনতে আমি একদম ভুল করিনি । এবারও আমি তাকে অবাক করে দিয়ে তার সামনে গিয়ে সেই ছোট বেলার মতো সেল্যুট ঠুকে দিলাম শুধু সেই ছোট খেলনা বন্দুকটি সাথে ছিল না ।অনেকটা উঁচু গলায় বললাম ,” বাবু ফ্রম বরিশাল ইজ রিপোর্টিং স্যার !” উনি কিছুটা হচকচিয়ে গিয়েও আমার সেল্যুট গ্রহণ করলেন ।তারপর আমার পরিচয় দেবার পর্ব,তিনি এবার হোহো করে হেসে উঠলেন এবং আবারো সেই ছোট বেলার মতো আমার গালটি টেনে দিলেন ।আমার বাচ্চাদের কোলে নিলেন। আমাকে স্বপরিবারে সুন্দর বনে যাবার দাওয়াত দিলেন।বললেন তুমি অবশ্যই সুন্দরবন বেরিয়ে যাবে, মনে করো গোটা সুন্দরবনটাই তোমার। আমার আর সুন্দরবন যাওয়া হয়নি।

এরপর আবার দেখা হলো গণজাগরণের সময় শাহবাগে । সেই একই কায়দায় সেলুট একই কায়দায় গাল টিপে দেয়া ।তবে বাড়তি দুইটা শব্দ যে কি শক্তি এনে দিয়েছিলো মনের জগতে তা শুধুই অনুভব করা যায়,ভাষায় প্রকাশ করা যায় না,”গুড জব মাই বয়” ।এই বিজয়বীর মুক্তিবাহিনীর সদস্য আবারো এসে দাঁড়ালেন নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে তাদের জন্য দুর্বার সাহসের আধার হয়ে ।

এরপর আমি লস এঞ্জেলেসে যখন আসলাম তখন আবিষ্কার করলাম রিপনকে । কেউ একজন আমাকে বললো রিপন জিয়াউদ্দিনের ভাগিনা,শুনেই আমি নিজেই গিয়ে তার সাথে আলাপ জমালাম।আমি রিপনকে যতবার দেখেছি ততবার ওর সাথে বুক মিলাতে কখনোই ভুল করিনি।আসলে ওর ভিতর আমি সব সময় মেজর জিয়াউদ্দিনকেই খুঁজেছি।

এতগুলো কথা বলার কারণ একটাই,পৃথিবীতে অনেক বড় মানুষ আসে কিন্তু শিশুদের সাথে সবাই শিশু হতে পারে না ।যা মেজর জিয়াউদ্দিন পেরেছিলেন।যা আমার অন্তরের শিশুটি কখনোই ভুলে যায়নি।ঠিক তেমনি আমার ছোট বাচ্চাদের সাথেও তিনি এক মুহূর্তেই বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।
হে বীর, এই জাতি বড়ই অভাগা,এরা এদের বীরদের সন্মান দেবার চাইতে টেনে নিচে নামাতেই বেশি পারদর্শী । তাই তো এ দেশে ১,৭৫,০০০ মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা বেড়ে ৪ লক্ষতে পৌঁছে যায়।জাতিরপিতাকে অস্বীকার করার জন্য ধর্মের বেসাতি খোঁজে।নিজেদের ৩০লক্ষ্য শহীদের সংখ্যা কমিয়ে ৩০,০০০ এ নামায়।রাজাকারদের বিরুদ্ধে যে “জননী” প্রজন্মের মনে নিভে যাওয়া আগুন জ্বলে দেয়, তাকে দেশদ্রোহী তকমা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়।যুদ্ধপরাধদের বিচারের দাবিতে যে প্রজন্ম সারাদেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলে তাদেরকে নাস্তিক বানিয়ে দেয় । এখানেই শেষ নয়, আজ আমারই আঙিনায় শহীদের রক্তের উপর দিয়ে হেটে যুদ্ধপরাধীদের দলবল আবার আমারই মানুষদের হাত ধরে আমারই ঘরের ভিতর অনায়াসে ঢুকে যায়।তবুও আমরা আশায় বুক বাঁধি আবারও,তোমাদের কাছ থেকে ধার করা সাহসে ,তোমাদের মুখে উচ্চারিত বঙ্গবন্ধুর সেই “জয় বাংলা” হুঙ্কারে । ওরা যতই ষড়যন্ত্র করুক না কেনো,তোমরা বেঁচে থাকবে আবহমানকাল ধরে বঙ্গবন্ধুর বাঙালীদের অন্তরে !!
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
জয় হোক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের

আমার ১৯৭১ এর ঠিকানা
আল আমিন,বাবু
দক্ষিণ বগুড়া রোড
বরিশাল !!
(ছবিটি ১৯৭১ সালের মেজর জিয়াউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন বেগ)