ওলিতে গলিতে, মোড়ে দোকানে বসে ব্যাংক, সেবা নেয় কৃষক-শ্রমিকও

13

ডেস্ক রিপোর্ট : হোক সেটা দেশের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা শহরতলী বাজার, সরকার অনুমোদিত কোনো ব্যাংক বা এনজিও কার্যক্রম না থাকলেও ঠিকই মিলছে ব্যাংকিং সেবা। অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষগুলোও নিচ্ছে ফাইনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের সেবা। শুধুমাত্র টিপসই দিয়েই তারা টাকা তুলছেন, জমা রাখছেন, নিচ্ছেন ঋণও। এসবই সম্ভব হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বদৌলতে।

কোনো ব্যাংকের শাখা নেই এমন পল্লি এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের এজেন্ট ব্যাংকিং দিন দিন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। টাকা উত্তোলন ও জমা দুটোই করা যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে। দিন দিন বাড়ছে পরিসরও।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সফলতা দেখে এই কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে মোবাইল অপারটেররাও। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সেবাটিতে যোগ হয়েছে শীর্ষ দুই সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা। নিজেদের বিভিন্ন আউটলেটে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর বিষয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে অপারেটর দুটি ১১টি শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে অনুমতিও নিয়েছে।

মূলত অবকাঠামোতে কম ব্যয় ও স্বল্প জনবল প্রয়োজন হয় বলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পরিচালন ব্যয়ও কম। ফলে গ্রাহককেও স্বল্প ব্যয় ও দ্রুততম সময়ে সেবা দেয়া যায়।

কেন্দ্রিয় ব্যাংক সূত্র জানায়, তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে ব্যয়সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন ও আন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করা হয়। এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বর্তমানে যাবতীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম করা যাচ্ছে।

একটি বৈধ এজেন্সি চুক্তির আওতায় প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এসব সেবা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে মূলধারার ব্যাংক নেই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- এই এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করার জন্য বৃহৎ কোনো অবকাঠামোর দরকার হয় না। বৈধ চুক্তি এই কার্যক্রমের অন্যতম শর্ত। ফলে দেশের কোথাও ই্উনিয়ন পরিষদের অফিস, কোথাও ওষুধের ফার্মেসী কিংবা ছোট-খাট আকারের দোকানেও চালু হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। বিষয়টি এখন এতোটাই সহজ যে, ঘর থেকে বের হয়ে দোকানে গিয়ে মোবাইলে রিচার্জ করার মতোই ব্যাংকের সেবা নিচ্ছে গ্রামের মানুষগুলো। যদিও এখন শহরেও এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সহজে এবং স্বল্প খরচে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা যাচ্ছে। যেমন- একজন গ্রাহক সহজেই খুব সামান্য পরিমান চার্জ প্রদান করেই নিকটস্থ এজেন্ট সেন্টারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল প্রদান করতে পারছেন। এছাড়া খুব সহজে অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারীর বিলও প্রদান করতে পারছেন। সামান্য পরিমান চার্জ প্রদান করে বিইএফটিএন, আরটিজিএস এবং এনপিএসবি-এর মাধ্যমে সহজেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তর করতে পারছেন এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। গ্রাহককে এজন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ব্যাংকের শাখায় যেতে হচ্ছে না।

এছাড়াও, একজন গ্রাহক তার কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে সঞ্চিত রেখে আকর্ষণীয় মুনাফা অর্জন করতে পারছেন। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষকেরও আয়ের একটি অন্যতম সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এজেন্ট ব্যাংকিং তৃণমূলের মানুষগুলোকে পাইয়ে দিচ্ছে ব্যাংকের স্বাদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৭ যা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪২টি। ২০১৭ সালে এজেন্ট ২ হাজার ৫৭৭ এবং আউটলেট ৪ হাজার ১৫৭টি যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৪ হাজার ৪৯৩ ও ৬ হাজার ৯৩৩টি।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০১৭ সালে আমানত সংগ্রহ করা হয় ১,৩৮৮ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালে ছিল ৩,১১২ দশমিক ৪১ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে বৈদেশিক রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে ১,৯৮২ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ৫,৫৫৭ কোটি টাকা। 

মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের রিটেল ডিস্ট্রিবিউশন এবং এজেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান মো. রিদওয়ানুল হক বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং পদ্ধতি চালু হওয়ায় সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা। মূলধারার ব্যাংক দূরে হওয়ায় এবং শিক্ষিত নয় বলে ব্যাংকের সেবা তারা ব্যাংকের সেবা নিতে পারতো না। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী এজেন্ট ব্যাংকিং-এর আওতায় মৌলিক ব্যাংকিং সেবাগ্রহনের মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে উপকৃত হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন নিরক্ষর কৃষক সহজেই আঙুলের ছাপের (বায়োমেট্রিক) মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খুলে তার ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন এবং সামগ্রিকভাবে পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় অন্তুর্ভুক্ত হতে পারছেন। এর ফলে দেশের যেকোন স্থানে অর্থ লেনদেন, স্থানান্তর এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সের টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। এছাড়াও, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টারের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর কাছে সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণ প্রদান করতে পারছেন এবং সহজে ঋণের কিস্তি আদায় করতে পারছে।

তিনি বলেন, এর ফলে একদিকে যেমন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষগুলো উপকৃত হচ্ছে, তেমনি ভাবে সরকারের উদ্দেশ্যও সফল হচ্ছে। কারণ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে আমাদের সবশ্রেণির মানুষকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। আর এই সুযোগ প্রসারিত করেছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম।

একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের (আইবিবিএল) উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া। তিনি বলেন, একটি বৈধ এজেন্সি চুক্তির আওতায় প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের (এমটিবি) হেড অব এজেন্ট ব্যাংকিং মদন মোহন কর্মকার বলেন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা স্থাপন এবং পরিচালনা ব্যয় বহুল হওয়ায়, এজেন্ট ব্যাংকিং একটি সময়োপযোগী বাস্তবসম্মত মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একজন এজেন্ট যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে এজেন্ট সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে সহজেই মৌলিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে পারছে বিধায় দিন দিন এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং কর্মসংস্থানের একটি দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, দুদিন আগেই অনুষ্ঠিত হলো ‘এমটিবি এজেন্ট ব্যাংকিং কনফারেন্স’। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতা বাড়ানো এবং কার্যক্রমকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১৩ সালে ব্যাংক এশিয়াকে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করে। ইতোমধ্যে মোট ২১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স পেয়েছে। এরমধ্যে ১৯টি ব্যাংক দেশব্যাপী তাদের এই ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো হলো- ডাচ বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক, স্যোশাল ইসলামি ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্যান্ডার্ড ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, এবি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ব্র্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক।

সার্বিক বিষয়ে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়ে সময়ে নানামুখী উদ্যোগ নেয়। এ উদ্যোগের ফলে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একদিকে প্রান্তিক মানুষ আর্থিক সেবার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন, অন্যদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াচ্ছে। তাই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার অব্যাহত থাকবে এবং এটিই হবে আগামী দিনের ব্যাংকিং। তাই বিষয়টির প্রতি সরকারের সর্বদাই মনোযোগী থাকা জরুরী।