ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হোক!

2

ডি সাইফ: বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক তোপের মুখে পড়েছেন। আবরার যখন খুন হলো, ক্যাম্পাসে যখন পুলিশ ঢুকেছে তখন তাকে পাওয়া যায়নি কোথাও। আর তিনি বলছেন, তিনি নাকি দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্ররা ফুঁসে উঠে তার বক্তব্যে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে তিনি সাহায্য করবেন বলে কথা দেন ক্যামেরার সামনে এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।

এই কথাটি একটি উত্তপ্ত সময়ে ফুঁসে উঠা ছাত্রদের সামনে বললেও প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন যে পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা করে চলে, তা তো কারো অজানা নয়। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে এমন কথা দেয়ার কথা বুয়েট ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের মনে থাকবে কিনা কে জানে৷

তবে, এখন সময় এসেছে ঠান্ডা মাথায় ভাবার, দেশে ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন আছে কিনা। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত কিনা তা ভাবার এখনই ‘হাই টাইম’।

বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের এক সোনালী ইতিহাস আছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সকল মতের ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রাজপথ আলোকিত করেছে। কিন্তু, নব্বুইয়ের পর ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হয়ে গেল ক্ষমতার ভাগবন্টনে সহায়ক শক্তি হওয়া। এর মধ্যে ছাত্র সংসদগুলো একে একে বন্ধ হলো। নেতৃত্ব তৈরি না হয়ে একেকটা মনস্টার তৈরি হতে লাগলো ছাত্ররাজনীতি নামক জাদুর মেশিনে।

যে দল যখন ক্ষমতায় সে দলের ছাত্রসংগঠন তখন রাজ করে, ত্রাস সৃষ্টি করে। এই ত্রাসের রাজত্ব এক চেটিয়া সবাই চালিয়েছে। চালাতে দেয়া হয়েছে। কোনো লাগাম টেনে ধরা হয়নি। কারণ, ক্ষমতাসীনদের জনবল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ছাত্রসংগঠনগুলো। এমপিরাও নিজের এলাকায় ছাত্র সংগঠন পুষেন, মন্ত্রীরাও প্রটোকলে ছাত্র সংগঠনের ছেলেপেলেদের দেখতে পছন্দ করেন।

এই ছাত্র সংগঠন নামধারী ক্ষমতা-ভোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি, মাদকসেবন, খুনোখুনি কোনো অভিযোগ বাদ যায় নি। তারা তাদের মূল সংগঠনের ক্ষমতাকে হাতিয়ার করে নিজেরাও প্যারালাল একটা ‘সরকার’ চালায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারাই সর্বে সর্বা। উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ থেকে টাকা খাওয়া, শিক্ষক নিয়োগে নিজেদের প্রার্থীর প্রতি অনৈতিক সমর্থন, হল দখল, সিট বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, দখলদারি — হেন কাজ নেই যা তারা করে না।

শুধু একটা ব্যাপারেই তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তা হলো ছাত্রদের স্বার্থ নিয়ে উচ্চকিত হওয়া। তারা যখন থেকে ছাত্রসংগঠনের রাজনীতিকে ক্ষমতার হাতিয়ার ভাবতে শুরু করেছে, তখন থেকে ক্ষমতাবিরোধী সব ভিন্নমত দমন করা তাদের অন্যতম কাজ হয়েছে। তারা ছাত্রদের অসহায়ত্ব নিয়ে রাজনীতির নোংরা খেলা খেলে। হলে ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেদের গণরুমে থাকতে দেয়ার বিনিময়ে তাদের দাস বানায়। ক্লাসের সময়ে যখন তখন প্রটোকল, হ্যান্ডশেক বিনিময়ের কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার প্রথা তাদের। গেস্টরুম নির্যাতনের কথা তো বেশ আলোচিত বিষয়ই। র‍্যাগিংও চালায় তারা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এগুলো তাদের ছাত্র রাজনীতি। একটা ছাত্রের জীবন অন্ধকার আর বিভীষিকাময় করে তোলা তাদের রাজনীতি।

আর যখনই কোনো আন্দোলন হয়, তাদের কাজ হয়, সেই আন্দোলন যে করেই হোক দমন করা। ছাত্রদের পাশে তো দাঁড়াতে দেখাই যায় না বরং তারা উলটো ছাত্র আন্দোলন দমাতে নির্লজ্জ হামলা চালায়। এটাকে তারা বলে, বিশৃঙ্খলা দমন, শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা।

এসব ছাত্র সংগঠন ছাড়াই ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বড় বড় আন্দোলন গুলো হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। ভ্যাট আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীরাই করেছে। সরকারি চাকুরিতে এখন ১ম ও ২য় শ্রেণীতে কোটা নেই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে। এই আন্দোলনেও মেইনস্ট্রিম ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও ছাত্র সংগঠনগুলো কি এমন ভূমিকা রেখেছে? উলটা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন এই আন্দোলনে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগের অন্ত নেই৷ অন্যের উপর হামলা শুধু নয়, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অনেকের।

এমন অবস্থায় ছাত্র রাজনীতি আরো লাগামহীন হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদধারী নেতাকে পদচ্যুত করার ঘটনা আমরা দেখেছি। আওয়ামীলীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বাছাইয়ের কাজ নিজে হাতে নেন, এবং নিজের বাছাই করা মানুষগুলোকেও অনৈতিকতার কারণে সরিয়ে দিতে হয়- তাহলে বুঝতে কি অসুবিধা হচ্ছে যে, নীতির প্রশ্নে শুদ্ধ এমন ছাত্রনেতা এখন বিরল। কিংবা এভাবেও বলতে পারি, ছাত্র রাজনীতির জাদুর মেশিনে ঢুকে পদ পেলেই কেউ কেউ নিজেকে সব কিছুর উর্ধ্বে ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করে যে, তার নৈতিক স্খলন হতে সময় লাগে না।

কিছুদিন আগে ছাত্রদল নামক আরেকটি সংগঠনের কাউন্সিল হলো। সেখানে যুবক বয়সী বুড়ো দেখতে দুজনকে ছাত্রসংগঠনের নেতা বানানো হলো। তারা মধুর ক্যানটিনে এসে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে স্লোগান দিচ্ছে। একটা ছাত্র সংগঠনের প্রধান ইন্টেরেস্ট কেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে? আবার ছাত্রত্ব বহু আগেই পেরিয়ে গেছে এমন লোকদের দিয়ে ছাত্র সংগঠন চালানো হচ্ছে। কেন? ছাত্রদের স্বার্থ এখানে কোথায়? এখানে ছাত্ররাজনীতিটা কই?

ছাত্ররাজনীতির নামে এই অদ্ভুত কালচার বন্ধ আরো আগেই হওয়া উচিত ছিল। লেজুড়বৃত্তিক আচরণ এতোটাই ছড়িয়ে গেছে যে, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষাটা গৌন হয়ে গেছে, মুখ্য হয়ে গেছে রাজনীতি। এই রাজনীতি প্রশাসনকেও মেরুদণ্ডহীন করে ফেলেছে পুরোপুরি। আমরা দেখছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা একেকজন কেমন চরিত্রের, কেমন চিন্তার মানুষ। শিক্ষা ব্যবস্থা দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে এই সামগ্রিক অবস্থার জন্যেই।

ছাত্রসংসদ থাকতে পারে বড়জোর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ আছে। সেখানে এক বাংলাদেশি কন্যা সেই সংসদে ভিপি। তাকে এজন্যে ছাত্রলীগ করতে হয়নি, ছাত্রদল করতে হয়নি। সংসদে নির্বাচন হবে, ছাত্ররা তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করবে যারা তাদের কথা বলবে। কিন্তু, এখানে সেই সংসদ নেতৃত্বকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক থাকতে হবে।

ছাত্ররাজনীতি থাকার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই এই সময়ে। যে ছাত্ররাজনীতি দুর্নীতির খবর হয়, ধর্ষণের খবর হয়, হত্যাকাণ্ডের খবর হয়, সংঘর্ষের খবর হয়, সেই ছাত্ররাজনীতি ছাত্রসমাজ এখন প্রত্যাখান করে। আবু বকর সিদ্দিক, বিশ্বজিৎ, আবরাররা বার বার খুন হবে, তরিকুলরা হাতুরির নিচে পড়বে, এহসানরা অন্ধ হবে নির্যাতনে- আর আমরা বিচার চেয়ে চিৎকার করে যাব? আর কত? আমাদের এখন স্থিরতা চাই। স্ট্যাবিলিটি চাই। তাই, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাই। ছাত্ররাজনীতি বিলুপ্ত হোক।

লেখক: ছাত্র।