রিফাত ফরাজীর নেতৃত্বে হামলা

17

বরগুনা প্রতিনিধি : রিফাত শরীফ হত্যায় নেতৃত্বে ছিল রিফাত ফরাজী এবং সহায়তায় ছিল তার ছোট ভাই রিশান ফরাজী।

গণমাধ্যমের কাছে আসা আর একটি সিসিটিভি ফুটেজে এমনটিই দেখা গেছে। এছাড়া কিলিং মিশনে ছিল অন্তত ২০ জন ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসছে।

রিফাত হত্যায় এখন পর্যন্ত মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এজাহারভুক্ত ১২ আসামীর মধ্যে এ পর্যন্ত পাঁচজন গ্রেপ্তার ও এর মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড পুলিশের সাথে বন্দুকযদ্ধে নিহত হন।

রিফাতের নেতৃত্বেই কিলিং মিশন, সহায়তায় রিশান ফরাজী:

গণমাধ্যমের কাছে আসা আর একটি সিসিিিটভির ফুটেজে দেখা যায়, ২৬ জুন সকাল ১০টা ৩ মিনিটের সময় বন্ড বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড রিফাত ফরাজী ও তার ছোট ভাই রিশান ৬ থেকে ৭ জনকে নিয়ে কলেজের সামনে অবস্থান করছে। ১০টা ৬ মিনিটের দিকে ২/৩ জনকে কলেজের ভেতরে পাঠায় রিফাত ফরাজী। ১০ টা ৯ মিনিটে ওই ২/৩ জনসহ আরো কয়েকজন কলেজের থেকে বের হয়ে কলেজ গেটের বিপরীতে এসে রাস্তায় দাঁড়ায়।

১০টা ৯ মিনিটে যখন কলেজ থেকে স্ত্রী মিন্নিসহ রিফাত শরীফ বের হয় ঠিক তখনি রিশান ফরাজীর নেতৃত্বে কয়েকজন রিফাত শরীফের পথ আগলে কিল ঘুষি মারতে মারতে সামনের দিকে নিয়ে আসে। এ সময় এদের সামনের দিকে ছিল রিফাত ফরাজী। কলেজ গেটের ৫০ গজ দূরে দাঁড়ানো নয়ন বন্ডের সামনে এনে ৭/৮ জন রিফাত শরীফকে কিল ঘুষি মারতে থাকে।

ঠিক এ সময় রিফাত ফরাজী ও আরেকজন দৌড়ে গিয়ে রামদা নিয়ে আসে। রিফাতের হাতে থাকা দুটি দায়ের একটি দেয়া হয় নয়নের হাতে। আরেকটি দিয়ে রিফাত ফরাজী কোপাতে থাকে রিফাত শরীফকে।

হত্যকান্ডে কমপক্ষে ২০ জন অংশ নেয় নানা ভাবে। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসছে সেসব তথ্য। মামলায় এখন পর্যন্ত  গ্রেপ্তারকৃতদেও মধ্যে  ৬ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল জবানবন্দি দিয়েছেন সাগর ও নাজমুল ইসলাম। এর আগে চন্দন, মো. হাসান, অলিউল্লাহ ও তানভীর হাসান জবানবন্দি দিয়েছেন।

এই চারজনের মধ্যে প্রথম তিনজন এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তাঁরা রিফাত শরীফকে কোপানোর সময় সেখানে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ফেসবুকের মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘বন্ড ০০৭ এ বার্তা পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন। হত্যা পরিকল্পনা সম্পর্কে গ্রুপে আগাম কোনো আলোচনা হয়নি। তাই তাঁরা জানতেন না।

এই হামলার নেতৃত্বে রিফাত ফরাজী এবং রিফাত শরীফকে প্রথমে কুপিয়ে জখমও করে সে। আর ঠিক তখনি নয়ন বন্ড উপর্যপুরি রামদা দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে চলে যায়। রিফাত শরীফকে কলেজ গেট থেকে নয়ন বন্ডের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং কোপানোয় সহায়তা করে  রিফাতের ছোট ভাই রিশান ফরাজী। তাঁদের মধ্যে রিশান এখনো গ্রেপ্তার হননি।

এক কর্মকর্তা জানান, অলিউল্লাহ, তানভীরসহ অন্যরা জবানবন্দিতে বলেছেন, এই হামলায় ০০৭ গ্রুপের অন্তত ২০ জন ছোট দলে ভাগ হয়ে হত্যাকা-ে অংশ নেন। হামলার সময় পথচারী বা রিফাত শরীফের দলের কেউ যেন এগিয়ে আসতে না পারে, তা সামলানোর দায়িত্ব ছিল একটি দলের। আরেকটি দল নয়ন বন্ড, রিফাত-রিশান ফরাজীসহ অন্য হামলাকারীদের মোটরবাইকগুলো পাহারা দিচ্ছিল, যাতে হামলার পরে সবাই বিনা বাধায় পালাতে পারেন।

কেবল সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের জেরে এত সাজানো গোছানো হামলা হয়েছে বলে মনে করেন না স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, কয়েক মাস আগেও নয়নের দলের সঙ্গেই দেখা গেছে নিহত রিফাত শরীফকে। তবে সম্প্রতি নয়নের বিরোধী পক্ষের সঙ্গে ওঠাবসা করতে দেখা যায় রিফাতকে। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চার আসামি হত্যাকা-ে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।

কিলিং মিশনে ২০ জন :

এদিকে কিলিং মিশনে অন্তত ২০ জন জড়িত ছিলে বলেও বেরিয়ে আসছে পুলিশের তদন্তে। তবে আসামীদের ধরতে এখনই সব প্রকাশ করতে চাইছেন না তদন্তকারীরা। খুনীদের কেউই ছাড় পাবে না বলেও জানিয়েছেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

গত ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এতে অংশ নেয় নয়ন বন্ড বাহীনির গ্যাং গ্রুপ জিরো জিরো সেভেন। এ ঘটনার পরদিন বৃহষ্পতিবার সকালে নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ বাদি হয়ে বরগুনা সদর থানায় ১২ জনের নামোল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন।

এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামী রিফাত ফরাজী, ৪ নম্বর চন্দন, ৯ নম্বর হাসান, ১১ নম্বর অলি ও ১২ নম্বর আসামী টিকটক হৃদয়কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

১ নম্বর আসামী নয়ন বন্ড পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। মামলার ৩ নম্বর আসামী রিশান ফরাজী, ৫ নম্বর মুছা বন্ড, ৬ নম্বর রাব্বি আকন, ৭ নম্বর মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, ৮ নম্বর আসামী রায়হান এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে সনাক্ত ও গ্রেফতার আসামীদের স্বীকারোক্তি অনুসারে কামরুল হাসান সাইমুন, সাগর, তানভীর ও রাফিউল ইসলাম রাব্বি নামের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

যদিও পুলিশ শুরু থেকেই বলে আসছে, আসামীরা তাদের নাগালের মধ্যেই আছে এবং শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে, কিন্ত ঘটনার প্রায় ১০ দিন অতিবাহিত হলেও এজাহারভুক্ত বাকি আসামীরা এখনো গ্রেফতার হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় জড়িত কেউই ছাড় পাবে না। শুরু থেকেই আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে কাজ করছি। বাকি আসামীদের  দ্রুতই আইনের আওতায় আনতে আমাদের কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে।