সহজে কঠিন কথা লিখতে পারেন রোমেন

116

ডা. আব্দুন নূর তুষার: আমাকে অনেকেই বই পড়তে দেন, কেউ কেউ ভূমিকা লিখে বইটিকে ভূমিষ্ঠ করানোর দায়িত্বের খানিকটা আমাকে দিয়ে সম্মানিত করেন। রোমেন এর বইটির ভূমিকাটি এখানে দিলাম। সাথে প্রচ্ছদও। বইটি সে উৎসর্গ করেছে এফডিএসআর নামক চিকিৎসক ও রোগীর অধিকার ও দায়িত্ব সংক্রান্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে। সংগঠনটির আমি উপদেষ্টা এবং এটিও আমার জন্য সন্মানের বিষয়।

আমি মনোযোগ দিয়ে রোমেন রায়হানের ছড়াকবিতার বইটি পড়ে তারপর ভূমিকাটি লিখেছি। পড়ে দেখতে পারেন। ভূূমিকা ও বই দুটোই।

——–

রোমেন রায়হান কেমন ছড়া লেখেন সেটা নিয়ে বলা মানে সময়ের অপচয়। তবে রোমেন কিভাবে এত সহজে কঠিন কথা লিখে ফেলেন সেটা নিয়ে বলা যেতে পারে। এই লেখকের সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৫ সালে যখন সে কেবল ১৬ ছাড়িয়ে ১৭। তখনি সে যেখানেই বসে আড্ডা দিতো দুলাইন ছড়া বলতো। একদিন সে বেশ গর্বের সাথে আমাকে বলেছিল, ”গদ্য বড় সোজা , ছড়া সোজা না। চেষ্টা করে দেখেন”। আমি তার আত্মবিশ্বাস অবাক হয়ে দেখেছিলাম। এখনো অবাক হই যখন দেখি লাইনের পর লাইন ছন্দ মাত্রা তাল লয় মিলিয়ে সে লিখে চলেছে বিরাট বিরাট ছড়া। আমি অবশ্য ছড়াকে কবিতা বলতে পছন্দ করি।

তার লেখাতে সমসাময়িক বিষয় থাকে, যেটা ছড়াতে থাকতে হয়। আর থাকে বিদ্রুপ, ব্যঙ্গ, সত্যভাষণ। আপাত নিরীহ শব্দাবলী তার হাতে পড়ে হয়ে ওঠে ধারালো ও সাহসী। লেখাপড়ায় আমরা দুজনেই চিকিৎসক। আমি বয়সে সামান্য বড় হওয়ার সুবাদে সবসময় তাকে উৎসাহ দেয়ার একটা জায়গায় ছিলাম। কিন্তু সে নিজেও আমাকে বহু কাজে উৎসাহ দিয়েছে। তার ছড়াগুলিই কখনও কখনও অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ হয়ে আসে।

যেমন এই বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এটা দেশের চিকিৎসক সমাজ শুধু নয়, পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করবে, চিকিৎসকদের প্রতিদিনের কষ্ট ও নিবেদন নিয়ে সবাইকে ভাবাবে। দেশের চিকিৎসকরা এই দেশের সাধারণ মানুষের ঘর থেকে আসা সন্তান। তারা আমাদেরই ভাইবোন। তাদের নিয়ে নানারকম মিশ্র মন্তব্য ও অপপ্রচার মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি করেছে, সেটা দূর করতে এই লেখাগুলি কাজ করবে।

সীমান্ত পার হলেই চিকিৎসক ভালো হয়ে যায় না। অথবা বিদেশেও হাসপাতালে রোগী মরে। সকলে বেঁচে থাকে না। আমাদের দেশের বড় বড় মানুষেরা যেমন সিংগাপুরে গেলেই বাঁচবেন বলে ভাবেন, সেটা যেমন ঠিক তেমন হিসাব নিলে দেখবেন নিকট অতীতে আমাদের বড় মানুষেরা সিংগাপুরেই বেশী মরেছেন।

তাই তাই তাই
রোগ সারাতে মন্ত্রী, আমি সিঙ্গাপুরে যাই…
(যতদিন রবে মাথার উপরে অকর্মণ্য টাকলা
উঠিতে থাকিবে স্বাস্থ্যখাতের যাবতীয় ছাল-বাকলা…)

এভাবে লেখার সাহস ও যোগ্যতা রোমেনের আছে।

রোমেন ছড়ার মধ্য দিয়ে সরকারী চাকুরি, পড়াশোনা, জীবনের প্রয়োজন, ডাক্তারের মান অপমান সকল বিষয়কে এমনভাবে বলেছেন যে পড়লেই পাঠক টের পেয়ে যাবেন কী এক উল্টোপথে আমাদের সমাজ চিন্তা করছে।

ডাক্তারও খায়, সেও টয়লেটে যায়, তারও অসুখ হয়, পেঁয়াজের দাম বাড়লে তারও অসুবিধা হয়। তারপরেও পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে লোকে কসাই বলে না, বলে ডাক্তারকে। অথচ কসাইয়ের পণ্য মাংসের সাথে পেঁয়াজের সখ্যতা অনেক বেশি। লোকের পকেট মেরে , ব্যাংকের টাকা লুটে যারা নিয়ে যায়, তাদের নিয়ে লোকের মাথাব্যথা কম। অথচ যে তাকে সুস্থ করে তোলে তাকে কিছু টাকা দিতে তাদের অনেকেরই পিত্তপ্রদাহ হয়।

রোমেন সমাজের এই দ্বৈত মানসকিতা নিয়ে লিখেছেন। আবার ডাক্তারদেরও তিনি ছেড়ে কথা বলেননি। তিনি সমাজ সচেতন, দক্ষ শিক্ষক ও সৃজনশীল মানুষ। গবেষণা করেন বলে তার দেখার চোখ প্রায় নিখুঁত।

ছড়া হিসেবে নয় বরং চারিদিকে ঘটে যাওয়া যা কিছু তার খানিকটা ভিন্নচোখে দেখার জন্য রোমেন রায়হানের লেখা পড়তে হবে। বড় হয়েছে যে মানুষ আমার চোখের সামনে তাকে নিয়ে লিখতে গেলে পুরো জীবনটা লেগে যায়। এই কয়েকটি লাইন অতি তুচ্ছ , সামান্য। তবে তার বইয়ের ভূমিকাতে আমার জায়গা পাওয়াটা সামান্য নয়। এই সন্মানটুকুর জন্য তাকে ও প্রকাশককে ধন্যবাদ।

আর পাঠককের জন্য এই বইয়ের একটি ছড়ার শেষ দুটি লাইন।

সেই খুশিতেই চওড়া হলো আমার মুখের হাসি
আমি গোলাম। রাজার দেওয়া লাত্থি ভালোবাসি।

চওড়া মুখের হাসি নিয়ে আমরা যে গোলামীর জীবনে বেঁচে থাকি, এই বইটা পড়ার সময়টুকু, সেই গোলামীর জীবন থেকে খানিকটা পরিত্রান পাবেন। ভালো লেখা আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। সেই জগতে আমন্ত্রণ।

ফেব্রুয়ারি ২০২০। ঢাকা