কি ভীষণ সীমাবদ্ধতার ভিতর এই যুদ্ধটা আমরা করছি?

298

ডা: সাবরীনা মোহনা: আমি কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে কর্মরত আছি।শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি,কারন আমার লেখার হাত একদমই আনকোরা।COVID19-র কারনে বিশ্বে উদ্ভুত পরিস্থিতে আমাদের হাসপাতালটিকে প্রথমে আইসোল্শন সেন্টার ও পরে চিকিৎসার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নির্ধারন করেন,যা আপনারা সকলেই জানেন।

এই সিদ্ধান্ত আমাদের সকল চিকিৎসকের মধ্যে ভিষন অন্যরকম একটা অনুভুতির সৃষ্টি করে।আমাদের মধ্যেও নানারকম আলোচনা ও সাইকোলজিকাল এফেক্ট তৈরী হয়।তখন সামনে উদাহরন ছিল চীনের আক্রান্ত ও মৃত্যু হার।

আমরা চিকিৎসক হলেও সেটা একটা আতংক তৈরী করে।এত উন্নত দেশ হিমশিম খাচ্ছে,আমরা কি পারব তাদের মতো?এই প্রশ্ন ছিল সবার মনে।সরকারের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞ কারন আমরা শুরু থেকেই কখনোই PPE সংকটে পরিনি এখন পর্যন্ত।সরকারের সর্বোচ্চ মহলে আন্তরিক নির্দেশনায় আমদের সবসময় যথেষ্ট PPEসরবরাহ করা হচ্ছে।কিন্তু এছাড়াও আমাদের অন্যান্য কিছু সমস্যা চলমান আছে যা আমাদের সুপার স্যার সমাধান করার জন্য নিরলসভাবে যথাযথ কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন।

কিন্তু এই ফোরামে আমার এই লেখনির কারন অন্য প্রসংগ।গত দুইমাস থেকে আমাদের সর্ব পর্যায়ের সকল চিকিৎসক,নার্স এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন।অনেকেই বিভিন্নভাবে মানসিক,শারিরীক,পারিবারিক ও সামাজিক সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও নিষ্ঠার সাথে আমাদের উপর রাষ্ট্রীয় অর্পিত দ্বায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।বিশ্বাস করুন সংখ্যায় রোগী সংখ্যা কম শুনালেও আমাদের ডিউটি রুমে আমাদের এক মিনিটও অবসর থাকেনা।

কিভাবে যে এক ডিউটির সময় গড়িয়ে অন্য ডিউটির বেলা আসে সেটা কাররই খেয়াল হয়না।প্রতি মুহুর্তে সংক্রমিত হবার আতংকের মধ্যেও নিয়মিত রোগীর ফলোআপ এবং চিকিৎসাসহ রোগীদের অন্যান্য অনেকদিক লক্ষ্য করতে হয়।এর মধ্যে তাদের মনোবল যাতে ভেঙে না যায় এবং ঔষধ ও খাবার সঠিকভাবে খাচ্ছে কিনা সেটাও লক্ষ্য রাখতে হয়।

আক্রান্ত অনেকেরই নানা রকম অন্যান্য শারিরীক সমস্যা আগের থেকেই থাকে,সেগুলোও নিয়মিতভাবে ল্যাব টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে পর্যবেক্ষণ করা হয়।আমাদের ভিষন ডায়নামিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের একটি আলাদা টিম আছেন যারা নিয়মিতভাবে সব রুগীর ফাইল আপডেট পর্যবেক্ষণ করেন ও রাউন্ড দিচ্ছেন।আমরা ইতিমধ্যে একজন আশি উর্দ্ধ COVID19 সংক্রমিত রোগীকে যার আরও কোমরবিড কন্ডিশন ছিল তাকে সুস্থ করতে পেরেছি।

একজন কিডনী রোগী যিনি নিয়মিত ডায়ালাইসিস পেতেন তাকে ডায়ালাইসিস প্রদানসহ অন্যান্য চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করেছি।এখানে প্রতিটা রোগীর সুস্থ হবার গল্পটা অন্যরকম।কারন প্রতিটা রোগী আবেগিকভাবে ভিষন নিকটজন হয়ে যান আমাদের প্রত্যেক চিকিৎসকের কাছে।তারা সুস্থ হলে যেমন আমাদের আনন্দ তাদের হারানোর বেদনাটাও তেমনি কষ্টের।কারন এই রোগে মৃত্যুও যেন একটা অভিশাপ।আমরাই তাই তাদের সৎকারের সমস্ত পর্ব পালন করেছি বিধি মোতাবেক।

এই সময়ে আমাদের নানা সীমাবদ্ধতাও আছে।সম্পুর্ন নতুন এই অভিজ্ঞতার কারনে কিছু জায়গায় আমদের কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি হচ্ছে যা থেকে আমরা শিখছি।প্রতিদিনই কর্মপরিকল্পনাতে নতুন কিছু যোগ করতে হচ্ছে।

এরমাঝে মিডিয়া এবং ফেসবুকে বিভিন্ন সময়ে আমরা সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছি।যার ফলে আমাদের প্রতি নানানধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।আমরা যারা এমনিই একটা স্নায়ুচাপের মধ্যে কাজ করছি তার মাঝে এই সমালোচনাগুলি আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়।

বিশেষত স্বজাতির সমালোচনার তীক্ষ্ন তীর নেতিবাচকভাবে আমাদের দিকেই থাকছে।একবার ভাবুন যখন দিন শেষে আমরা এইগুলি দেখি বা শুনি আমাদের কেমন লাগে?আমাদের সবচেয়ে সিনিয়র ম্যাডাম যিনি আর ছয়মাস পর রিটায়ার্ড করবেন,যার শ্বাসকষ্ট ও ডায়াবেটিস আছে তিনি যে নিরলস পরিশ্রম করছেন,আইসিইউতে প্রতি মুহুর্ত সংক্রমিত হবার ঝুঁকি নিয়ে যে চিকিৎসা দিচ্ছেন,ঘরে অসুস্থ পিতা-মাতা,অটিস্টিক শিশু,অসুস্থ সন্তান,নবজাতক শিশু, পরিবার এবং নিজের অসুস্থ শরীর যা অতিরিক্ত কাজের ফলে ঝুঁকিতে ফেলে কাজ করছেন তাদেরকে আপনারা সমালোচনা করে কি প্রতিদান দিচ্ছেন? আপনি আমাদের জায়গায় নেই।একটিবার ভাবুন আমরা কি করছি?কি ভীষন সীমাবদ্ধতার ভিতর এই যুদ্ধটা আমরা করছি?আমরাতো আপনাদেরই অংশ।আমাদের অর্জন বাংলাদেশের গোটা চিকিৎসক সমাজেরই অর্জন।প্লিজ দয়া করে সমালোচনার বাণ আর ছুড়বেন না।

স্বজাতি হিসেবে এইটুকু দাবী আমরা করছি।আমরা প্রসংশা চাইনা,হাত তালিও চাই না,শুধু একটু সহমর্মী হোন আমাদের প্রতি।এই যুদ্ধে আমাদেরকে চালিয়ে যাবার জন্য এই সহমর্মীতাই প্রেরণা হবে।

লেখক: মেডিকেল অফিসার, COVID19 কন্ট্রোল রুম, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল।

Bangladesh

Confirmed
49,534
+2,381
Deaths
672
+22
Recovered
10,597
Active
38,265
Last updated: জুন ১, ২০২০ - ৯:৪৭ অপরাহ্ণ (+০০:০০)