কি প্রচার করছে হানিফ সংকেতের ইত্যাদি!

2952

এড্রিক বেকার, কাইলাকুড়ি ও সম্মানিত হানিফ সংকেত সাহেবকে নিয়ে সাধারণ মানুষের নানা রকম মন্তব্য দেখে কিছু কথা বলা দরকার।

ডাক্তারদের কে মারলো, কে গালি দিলো, তিনি কি ক্রিকেটার , নাকি ভিআইপি , নাকি সেলেব্রিটি, এটা বিবেচনা করবেন নাকি ডাক্তার মারা , গালিগালাজ করা, ডাক্তার কম্যুনিটিকে হেয় করাকে সবার জন্যেই অপরাধ বলে মনে করতে পারেন।
আপনাকে সেলেব্রিটি লাথি দিলে জায়গাটা বাঁধিয়ে রাখবেন আর অন্য কেউ দিলে তার শাস্তি চাইবেন…এরকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আপনি লাভবান হতে পারেন, কিন্তু সমষ্টি তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সেলিব্রিটির দায়িত্ব আছে। তিনি যখন গণমাধ্যমে কিছু বলবেন তখন তাকে সঠিক ও সত্য বলতে হবে। কাউকে দোষী করলে, অমর্যাদা করলে ব্যক্তিগতভাবে তাকে বোঝাতে পারেন যদি আপনি মনে করেন। কিন্তু আপনার কম্যুউনিটির এক লক্ষ লোককে তিনি ছোট করার পরে তাকে বোঝাতে গেলে এটাই বোঝাবেন , গণমন্তব্য করার পরে প্রকাশ্যেই ক্ষমা বা দুঃখপ্রকাশ করতে হবে। গরু মেরে জুতা দান করার মতো সকলকে হেয় করে তারপর আরেকদিন সকলকে ভালো বলা অর্থহীন।

কে ছিলেন এই বেকারঃ-
এড্রিক বেকার একজন মহান মানুষ। তিনি নিউজিল্যান্ড থেকে এমবিবিএস করে ভিয়েতনামে গিয়েছিলেন দক্ষিন ভিয়েতনাম সরকারকে সাহায্য করতে। সরকারী এক ডাক্তার দলের সদস্য হিসেবে তিনি সেখানে সিভিলিয়ানদের চিকিৎসা দিতেন। তাকে উত্তর ভিয়েতনামী যোদ্ধারা আটক করে জেলে রাখে ও পরে দেশে পাঠিয়ে দেয়। পরে তিনি শিশু রোগে পড়াশোনা করেন। উইকি বলছে তার ক্রিশ্চিয়ানিটির প্রেরণায় তিনি বাংলাদেশের দরিদ্রদের চিকিৎসা করতে চলে আসেন। ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ানদের মধ্যে এরকম অনেক দেখা যায়। তারা মানবতার সেবার মাধ্যমে রিডেম্পশন পাবেন বলে মনে করেন। মানবসেবায় নিজেকে সঁপে দেন।

তিনি কাইলাকুড়ি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট নামে যে প্রকল্প চালু করেন সেটি নিউজিল্যান্ড , ইউ কে ও ইউ এস এ থেকে সরাসরি দান সংগ্রহ করে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডে তাদের এই চ্যারিটি খুবই সক্রিয়।
এই প্রকল্পে চাইলে যে কেউ দান করতে পারে। তাদের আমেরিকা অংশে ছিলেন টেড রোজ, নিকোলাসে সেফোস এবং জেসন ও মেরিন্ডি মর্গানসন। বাংলাদেশে এটি দেখাশোনা করেন পিজন নংমিন ও সুজিত রাংসা, নিউজিল্যান্ডে পিটার উইলসন, হিলারি লিঞ্চ ও গ্লেন বেকার।

এড্রিক বেকার মারা যান ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি হাইপারটেনশনের জটিলতায়। তিনি বেঁচে থাকতে ইত্যাদি অনুষ্ঠানে এসে তরুন ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বলেছিলেন। গ্রামকে মনে রাখতে বলেছিলেন। কোথাও তার কাইলাকুড়ি প্রকল্পের দায়িত্ব নিতে বলেন নাই , কারণ এটা দেখাশোনা করার লোক ছিল এবং আছে।

বেকার বেঁচে থাকার সময় এবং পরেও এখানে বিদেশীরা এসে স্বেচ্ছাশ্রম দিতেন এবং বাংলাদেশী চিকিৎসক ও সেবাপ্রদানকারীরা কাজ করতেন। জেসন ও মেরিন্ডিও এখানে তার বেঁচে থাকার সময় একাধিকবার এসেছিলেন। পরেও এসেছেন। এখানে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ থেকে রোস্টারে নিয়মিত ২ মাস করে দুজন ডাক্তার সারাবছর সেবা দেন। এছাড়াও আরো তিনজন ডাক্তার সেখানে সেবা দেন, যার মধ্যে ডাক্তার রাকিব বেতন এর টাকা নেন না। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এখানে সেবা দেয়া হয়। বারডেম সেবা দেয়। কে জামান আই হসপিটাল সেবা দেয়। প্যাসিফিক ফার্মা এখানে বছরে ৬ লক্ষ টাকার ঔষধ দেয়।

অবশ্যই ইত্যাদিতে বেকার এর প্রচারণা তাদের কাজে লেগেছিল। যার কারণে সরকার বেকারকে নাগরিকত্ব দেন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর তাদের সরকারী অর্থ সহায়তা দেয়।

এই প্রকল্পটি এখন এনজিও হিসেবে এনজিও ব্যুরোতে তালিকাভূক্ত হয়েছে। পিজন নংমিন ডেইলি স্টার পত্রিকায় বলেছেন, বেকারের মৃত্যুর পরে পুরো সময়টা সরকারী ও বেসরকারী সাহায্য ও ব্যক্তি সহায়তায় এই প্রকল্পটি আগের মতই চালু ছিল , কোন সমস্যা হয় নাই।

জেসনের সাথে বেকারের পরিচয় হয় ১৯৯৯ সালে। বেকারের মৃত্যুর পরে যে লিংক গ্রুপ এটা দেখাশোনা করতো, তাদের পক্ষ থেকে পিটার উইলসন এটি তদারক করেন ২০১৮ পর্যন্ত । তিনি আর এই কাজটি করবেন না বলাতে , জেসন ও মেরিন্ডি ভলান্টিয়ার করেন।

তাদের ব্যয় নির্বাহ হয় সংগঠনের টাকায়। তারা রোগীদের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা দেন, সংগঠন তাদের বেতন দেন।
অবশ্যই এটি একটি মহৎ কাজ।

কিন্তু একে মহৎ বানাতে গিয়ে এটা বলার কারন নাই যে,

“ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় , মৃত্যুর আগে তিনি ইত্যাদিতে এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন তার কথায় স্বদেশী কেউ সাড়া না দিলেও, সাড়া দিয়েছেন ডা. জেসন ও মেরিন্ডি“

এখানে লিংক গ্রুপ এই প্রতিষ্ঠানটি চালিয়েছে পিটার উইলসনকে দিয়ে, সেখানে দেশের কারো কি সুযোগ ছিল এটার দায়িত্ব নেবার? সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে ক্রিশ্চিয়ান চ্যারিটির দায়িত্ব কি কোন মুসলিমের পক্ষে নেয়া সম্ভব? নিলে হয়তো কোন ক্রিশ্চিয়ান ভাইকে এটা নিতে হতো। তাদের মধ্যে এমনিতেও চিকিৎসক কম।

অবশ্যই এই কথা বলে ডাক্তারদের সমাজসেবায় অনীহা, মমতাহীন , সেবা বিমুখ বলে প্রমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। আপনারা ভিডিও দেখলে দেখবেন বেকারের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তিনি আগেও এটা বলেছিলেন… বেকার যখন বলছিলেন আপনারা গরীব মানুষ ভুলে যাবেন না, গ্রাম অঞ্চল ভুলে যাবেন না… কথা কেড়ে নিয়ে বললেন ”মানে গ্রামে গিয়ে যাতে চিকিৎসা দেয় তারা…

গ্রামে ডাক্তার যায় না কথাটা কখনো কখনো সত্য বটে.. কিন্তু ডাক্তার গ্রামে যেতে হলে সে একা যেতে পারে না। বেকার এর কাইলাকুড়িতে কিন্তু ৫ জন ডাক্তার যাচ্ছে। সরকারী সেন্টারে এখন সরকারী ডাক্তাররা যাচ্ছে। কারণ সেখানে প্রতিষ্ঠান আছে।

ডা. বেকার বললেন সকলকে গ্রামের কথা মনে রাখতে , ভুলে না যেতে, তিনি কোথায় বলেছেন, আসেন আমার মৃত্যুর পরে কাইলাকুড়ির দায়িত্ব নেন?

তিনি যে অসুস্থ সেটাও বলা হয়নি কোথাও। অথচ তিনি প্রায় ৫ বছর পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভুগেছেন।

সব তথ্য পেলেন।

এবার বলেন, কি কারণে বলা যেতে পারে যে দেশের কোন ডাক্তার এগিয়ে আসেন নাই? তার মানে কথাটা মিথ্যা। সকল ডাক্তারের বিরুদ্ধে বলা একটি বানোয়াট বচন।

এটার প্রতিবাদ করা দরকার। এটা কে বলেছেন সেটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। তিনি বলাতেই বিষয়টা ক্ষতিকর বেশী হয়েছে।