করোনা ভাইরাস: ‘প্রতিরোধ সবচেয়ে বড় চিকিৎসা’

2271

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনা ভাইরাসের কোন চিকিৎসা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, প্রতিরোধই এর সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।

মঙ্গলবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে চিকিৎসকরা এমন মত দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার সাব কমিটির আয়োজনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া।  বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ শহীদুল্লাহ সিকদার, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।

অনুষ্ঠানে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শামীম আহমেদ।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায় নি। ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরণের করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ধরণের ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি।

‘লক্ষণগুলো কতটা মারাত্মক’ সে বিষয়ে তিনি বলেন, জ্বর দিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়, এরপরে শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। প্রায় এক সপ্তাহ পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়। প্রতি চারজনের মধ্যে অন্তত একজনের অবস্থা মারাত্মক পর্যায়ে যায় বলে মনে করা হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হালকা ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে মৃত্যুর সব উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, কোন একটি প্রাণী থেকে এসে এসব ভাইরাস মানব শরীরে বাসা বাধতে শুরু করে। একবার যদি ভাইরাসের উৎস প্রাণীটি সনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে রোগটি মোকাবেলা করা অনেক সহজ হয়। করোনাভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে চীনের উহায়ের দক্ষিণ সমুদ্রের খাবারের পাইকারি বাজারের সঙ্গে। যদিও বেশ কিছু সামুদ্রিক প্রাণী করোনাভাইরাস বহন করতে পারে (যেমন বেলুগা তিমি), ওই বাজারটিতে অনেক জীবন্ত প্রাণীও থাকে, যেমন মুরগি, বাদুর, খরগোশ, সাপ- এসব প্রাণী করোনাভাইরাসের উৎস হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, রোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সপ্তাহে প্রায় ৪০ থেকে ৮০০জন আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মধ্যেও বিভ্রান্তি আছে। বেশিরভাগ নতুন রোগী আগে থেকেই চীনে ছিল, শুধুমাত্র চীন তাদের নজরদারি বাড়ানোর পর সনাক্ত হয়েছে। ফলে মহামারিটির বিস্তার সম্পর্কে খুবই কম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় বলেও মনে করেন তিনি।

ভাইরাসটির ফলে যেসব পরিবর্তন ঘটতে পারে সে বিষয়ে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা হয়তো একজন ব্যক্তি থেকে আরেকজন ব্যক্তিতে ছড়ানোর জন্য পরিবর্তিত হতে পারে কিংবা আরো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

‘ভাইরাসটি নিজে থেকে ধ্বংস হবে না। শুধুমাত্র চীনের কর্তৃপক্ষে নেয়া পদক্ষেপই এই মহামারীর অবসান ঘটাতে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

বিএসএমএমইউ’র এ চিকিৎসক আরও বলেন, ভাইরাস প্রতিরোধ করতে কোন ভ্যাকসিন বা টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এই রোগ থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় হলো অন্যদের মধ্যে ভাইরাসের সংক্রমণ হতে না দেয়া।

এসময় তিনি বেশ কিছু পরামর্শও প্রদান করেন। সেগুলো হলো- মানুষজনের চলাচল সীমিত করে দেয়া; হাত ধুতে সবাইকে সবাইকে উৎসাহিত করা; স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পড়ে রোগীদের আলাদা আলাদা করে চিকিৎসা সেবা দেয়া।

তিনি বলেন, এর কোন প্রতিষেধক নাই। তবে রোগটির প্রতিষেধক আবিষ্কারের কাজ চলছে। মার্স ভাইরাসের (সেটিও একটি করোনাভাইরাস) প্রতিষেধক আবিষ্কারে যে গবেষণাটি চলছিল, সেটির কারণে এই কাজ অনেক এগিয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেক চিকিসৎক ড. নাজমুল হাসান বলেন, মানব শরীরের প্রথমবারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, এমন যেকোনো ভাইরাস নিয়েই আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত, কারণ এটা প্রথম সারির বাধা অতিক্রম করেই ছড়িয়েছে।

তিনি মনে করেন, হিপাটাইটিস ভাইরাস এর চেয়ে ভয়ংকার। কেননা এই ভাইরাসের ফলে এখনো মানুষ মরছে। সুতারং সচেতন থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর করোনা ভাইরাস একবার মানব কোষের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ার এবং প্রতিলিপি তৈরির পরে এটা দ্রুত রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ফলে এটা আরো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, এই সেমিনারের মাধ্যমে আমরা প্রাথমিকভাবে আপনাদের জানিয়েছি। প্রতিরোধ সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। সরকার এ ব্যাপারে যেসব বিষয়ে পরামর্শ দিবে আমরা সে ব্যাপারে গাইডলাইন তৈরি করে দিব।

তিনি জনগণের মধ্যে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করতে হবে। কোন পেনিক (ভীতি) সৃষ্টি করা যাবে না।

সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেডিসিন অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. মোঃ জিলন মিঞা সরকার, বেসিক সায়েন্স ও প্যারা ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. খন্দকার মানজারে শামীম, শিশু অনুষদের ডীন ও সেমিনার সাব কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. চৌধুরী ইয়াকুব জামাল, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান, ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, সেমিনার সাব কমিটির সদস্য সচিব সহযোগী অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ প্রমুখ।

Covid-19 Effects in Bangladesh

164
Confirmed
17
Deaths
33
Recovered