করোনাভাইরাসের গুজব ছড়িয়ে বাজারে ফায়দা লোটার চেষ্টা

2

অবশেষে নিত্যপণ্যের বাজারে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাজারে খাদ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে- এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কৌশলে এমন গুজব ছড়িয়ে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

আর এসব কারসাজি করেই ৪ দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তা চালে (৫০ কেজি) সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। সব ধরনের মাংসের দামও বেড়েছে ৫০-৬০ টাকা। এ ছাড়া মসুর ডাল, শুকনা মরিচ, আদা, হলুদ, মুগ ডাল, আটা-ময়দা ও গুঁড়া দুধের দামও বাড়ছে। আতঙ্কে ভোক্তাদের মধ্যে বেশি করে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এর ফলে মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষ পড়েছে বিপাকে।

বুধবার সচিবালয় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার ২৫-৩০ শতাংশ পণ্য বেশি মজুদ আছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক ক্রয় করলে কোনো সংকট হবে না। একইদিন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, করোনার কারণে খাদ্য সংকট হবে না, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। কোনো ব্যবসায়ী, মিলার করোনাকে পুঁজি করে যদি বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তাহলে সরকার চুপ করে বসে থাকবে না। বাজার মনিটরিং জোরদার করতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে চিঠি পাঠিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজারের খুচরা চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৫৪-৫৫ টাকা। চার দিন আগে ছিল ৫০-৫২ টাকা। নাজিরশাইল বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৫ টাকা, চার দিন আগে ছিল ৫৬-৬০ টাকা। বিআর-২৮ বিক্রি হয়েছে ৩৮-৪০ টাকা, ৩ দিন আগে ছিল ৩৩-৩৪ টাকা।

বাদামতলী ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে বুধবার প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) মিনিকেট বিক্রি হয়েছে ২৬৫০-২৭৫০ টাকা, ৩ দিন আগে ছিল ২৪৫০ টাকা। প্রতি বস্তা নাজিরশাইল বিক্রি হয় ২৬০০ টাকা, ৩ দিন আগে ছিল ২৪০০ টাকা। বিআর-২৮ প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ১৯০০ টাকা, ৩ দিন আগে ছিল ১৭৫০ টাকা।

কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, মিলমালিকরা করোনা দেখিয়ে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪ দিনে বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। নতুন করে চাল দিচ্ছে না। অগ্রিম টাকা দেয়ার পরও টাকা ফেরত দিয়ে নতুন করে বাড়তি দর ধরে দিয়েছে। মিলাররা মূলত বাজারে চাল থাকবে না গুজব ছড়িয়েছে। ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে চাল মজুদ করতে শুরু করেছেন।

এদিকে দিনাজপুর, নওগাঁ, বগুড়ার মিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল মিল পর্যায় বিক্রি হচ্ছে ২৫৫০ টাকা, তিন দিন আগে ছিল ২৪০০ টাকা। নাজিরশাইল বিক্রি হয়েছে ২৬০০ টাকা, তিন দিন আগে ছিল ২৪০০ টাকা। বিআর-২৮ বিক্রি হয়েছে ১৮৭২ টাকা বস্তা, তিন দিন আগে ছিল ১৬৫০ টাকা।

এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, ধানের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে চালের দামও কিছুটা বেড়েছে। করোনার প্রভাবকে ইস্যু করা হয়নি। তবে খুচরা বাজারে যে হারে চালের দাম বেড়েছে, সে হারে মিল মালিকরা বৃদ্ধি করেনি।

বুধবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, সারা বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করেছে। করোনাভাইরাসের জন্য চাল-গম নিয়ে ভোক্তারা যেন আতঙ্কিত না হয়। কোনো ব্যবসায়ী, মিলার এটাকে যদি পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে, বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, কোনোক্রমেই সরকার চুপচাপ বসে থাকবে না।

পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। শুধু মজুদই নয় আমরা ওএমএসে চাল বিতরণের জন্য মিলারদের চিঠি দিয়েছি। আমাদের আটা বিক্রি সব সময় চলছে, চলবে। চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ মজুদ করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে চাল ছাড়াও করোনার প্রভাবে রাজধানীর বাজারে একাধিক পণ্যের দাম বাড়িয়েছে বিক্রেতারা। বুধবার টিসিবির দৈনিক বাজারমূল্য তালিকায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি গরুর মাংস সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা, এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৬০ টাকা। খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহ আগে ছিল ৮৫০ টাকা, এক মাস আগে ছিল ৮০০ টাকা।

মঙ্গলবার প্রতি কেজি দেশি আদা বিক্রি হয়েছে ১১০-১৩০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ১০০-১১০ টাকা। আমদানি করা আদা বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৫০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১৬০-১৪০ টাকা। মসুরের ডাল (বড় দানা) বিক্রি হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ৬৫-৭০ টাকা। হলুদ বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১৩০ টাকা। প্রতি কেজি মুগডাল বিক্রি হয়েছে ১২৫-১৩৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ১২-১৩০ টাকা।

দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি রোধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কাছে খাদ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা আশঙ্কাও নেই। আশা করছি, রমজান মাসেও চাল ও আটার মূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। তাই বাজার স্থিতিশীল রাখতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর কর্তৃক বাজার মনিটরিং জোরদারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।

নয়াবাজারে তুহিন স্টোরের পণ্য কিনতে আসা রাকিবুল যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বিক্রেতারা বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি সামনে আরও বেড়ে যায় সে আশঙ্কায় একটু বেশি করে পণ্য কিনছি। জানতে চাইলে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, ভোক্তাকে তার সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যাতে তাদের কারণে পণ্যের দাম না বাড়ে। কেউ যাতে ১০ দিনের পণ্য এক দিনে ক্রয় না করে। তিনি বলেন, সরকারের তদারকি সংস্থাগুলোকেও সজাগ থাকতে হবে। এমনটা হলে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যশস্যের মজুদ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে ক্রেতা হিসেবে স্বাভাবিক ক্রয় করলে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ায় জনগণ আতঙ্কিত হয়ে গেছেন। তারা হঠাৎ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনছেন। অতিরিক্ত পণ্য কিনে বাজারে অহেতুক অস্থিরতা তৈরি করবেন না।

তিনি বলেন, মুজিববর্ষকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে টিসিবি চিনি, ডাল, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজ কম বিক্রি শুরু করেছে। আসন্ন রমজানেও অন্য বছরের তুলনায় ৭ থেকে ১০ গুণ পণ্য নিয়ে মাঠে থাকবে টিসিবি। জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, আমরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছি। তবে এই চিঠি পাওয়ার আগ থেকেই আমাদের বাজার মনিটরিং টিম কাজ করছে। কেউ অসাধুভাবে দাম বাড়ালে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।